শনিবার, ১৫ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

এক বছরে দেশে এলো ৪১৪৩ প্রবাসীর লাশ

জগন্নাথপুর পত্রিকা ডেস্ক :

ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে কাজের খোঁজে প্রতিবছর দেশ ছাড়েন হাজারও মানুষ। প্রবাসে গিয়ে অনেকের ভাগ্য বদল হয়, স্বপ্ন পূরণ হয় নানা কাঠখড় পুড়িয়ে। তবে অনেকে দুর্ভাগ্যেরও শিকার হন। তারা ফিরে আসেন দেশের মাটিতে; লাশ হয়ে কফিনে শুয়ে। দিনে দিনে এই লাশ হয়ে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলছে। পরিসংখ্যান অনুসারে গত অর্থবছরের আওতায় চলতি বছরের মে মাসে প্রবাসী শ্রমিকদের সর্বোচ্চ মরদেহ এসেছে বিদেশ থেকে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় আনা হয় এসব মরদেহ।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক বছরের তথ্য অনুসারে, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এক বছরের হিসাবে বিদেশ থেকে মোট ৪ হাজার ১৪৩ জন শ্রমিকের মরদেহ এসেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৪৫ জনের মরদেহ এসেছে গত মে মাসে। এ ছাড়া গত বছর জুলাইতে এসেছে ৩৩৯ জন, আগস্টে ৩৫৪ জন, সেপ্টেম্বরে ৩১৩ জন, অক্টোবরে ৩১১ জন, নভেম্বরে ৩৩৮ জন, ডিসেম্বরে ৩৫৪ জনের মরদেহ এসে পৌঁছায় দেশে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আসে ৩৪১ জনের মরদেহ, ফেব্রুয়ারিতে ৩২৫ জনের, মার্চে ৩৩৪ জনের, এপ্রিলে ৩১৭ জনের এবং জুন মাসে ৩৭২ জনের মরদেহ আসে।

জানা গেছে, সরকারের পক্ষ থেকে এসব শ্রমিকের মরদেহ পরিবহন ও খরচ বাবদ অর্থ বরাদ্দ করা হয়। ওই এক বছরে সব মিলিয়ে এই খাতে সরকার ব্যয় করেছে ১৪ কোটি ৫০ লাখ ৫ হাজার টাকা।

 

বিদেশে কাজে গিয়ে যারা মারা যান তাদের মধ্যে অনেকের মৃত্যু হয় অনিরাপদ পথে পাড়ি দিতে গিয়ে, কেউ মারা যান নির্যাতনে, কেউ অমানুষিক পরিশ্রমে অসুস্থ হয়ে কেউবা বিভিন্ন দুর্ঘটনার মুখে পড়ে।

এদিকে মৃত্যু ছাড়াও বিদেশে কাজের জন্য যাওয়া বৈধ অভিবাসীদের নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। এক্ষেত্রে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে গ্লোবাল কমপ্যাক্ট ফর সেফ, অর্ডালি অ্যান্ড রেগুলার মাইগ্রেশন (জিসিএম) কার্যক্রমের আওতায় উঠে এসেছে প্রবাসী শ্রমিক নিপীড়নের চিত্র।

ওই গবেষণার ফলাফল অনুসারে প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ স্বাস্থ্য, ৬৯ শতাংশ খাদ্য ও ৪৪ শতাংশ আশ্রয় সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত হয়। এ ছাড়া শ্রমিকদের ৪১ শতাংশ নারী ও ১৪ শতাংশ পুরুষ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। অন্যদিকে নারীদের মধ্যে ৭ শতাংশ যৌন নির্যাতনের কবলে পড়েন। আবার শ্রমিকদের মধ্যে বড় একটি অংশ কোম্পানিতে কাজের সময় অপমানিত হন। যে হার নারীদের ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ ও পুরুষের ক্ষেত্রে ৩৪ শতাংশ। ১১ শতাংশ পুরুষকর্মী কোম্পানিতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। ২৬ শতাংশ কর্মী সব ক্ষেত্রেই মানসিক নিপীড়নের শিকার হন। এসব নিপীড়ন-নির্যাতনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে সৌদি আরবে।

ওই গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে ৫২ শতাংশ ভাষাগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। ৪১ শতাংশ অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, ২৭ শতাংশ অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুবিধা, ১২ শতাংশ কর্মী খারাপ আশ্রয়স্থল, ১৬ শতাংশ রিক্রুটিং এজেন্সির অসহযোগিতা পেয়ে থাকেন।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ রবিবার উদযাপন হচ্ছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রবাসী কর্মীরা উন্নয়নে অংশীদার/সমুন্নত রাখব তাদের অধিকার।’

অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত অনুসারে আমরা দেখেছি সবচেয়ে বেশি প্রবাসী মারা যান মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত (ব্রেইন স্ট্রোক) কারণে। এদের একটা বড় অংশই মধ্যবসয়ী কিংবা তরুণ। এ ছাড়াও হৃদরোগসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা কিংবা প্রতিপক্ষের হাতেও খুন হন বাংলাদেশিরা।

শরিফুল হাসান বলেন, তরুণ কিংবা মধ্যবয়সে কেন এত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন সে বিষয়ে রাষ্ট্রীয় কোনো অনুসন্ধান হয়নি। যদিও আমরা মৃতদের স্বজন ও অন্যান্য মাধ্যমে জানতে পারি, মধ্যপ্রাচ্যে যারা মারা যান তাদের বেশির ভাগই প্রচণ্ড গরমে প্রতিকূল পরিবেশে টিকতে পারেন না। একদিকে প্রতিকূল পরিবেশ, আরেকদিকে অমানুষিক পরিশ্রম থেকে মানসিক চাপের কারণে সাধারণত স্ট্রোক বা হৃদরাগের মতো ঘটনা ঘটে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা:

এদিকে গতকাল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের (এসআইপিজি) সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের (সিএমএস) উদ্যোগে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস উপলক্ষে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ‘সমুদ্রের ওপারে স্বপ্ন: ইউরোপে অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসনের বাস্তবতা উন্মোচন’ শীর্ষক এই সেমিনারে উপস্থাপিত এক তথ্যে জানানো হয়েছে, যারা বিদেশে গেছেন তাদের অন্তত ২২ শতাংশ উন্নত জীবনের আশা নিয়ে অভিবাসী হয়েছেন।

সেমিনারে বিদেশ ফেরত একশজনের ওপর পরিচালিত এক গবেষণার তথ্যে জানানো হয়, ৪৫ জন ইউরোপের পথে পাড়ি দিয়ে মাঝ পথ থেকেই ফিরে এসেছেন। ৩০ জন ইউরোপে ঢুকলেও কোনো কাজ করার আগেই ধরা পড়ে দেশে ফিরেছেন। আর বাকি ২৫ জন কিছু সময় কাজ করার পর ধরা পড়ে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন।

সেমিনারে আরও জানানো হয়, বাংলাদেশে ২০০৯ থেকে শুরু করে ২০২১ সাল পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছাতে পেরেছেন ৬২ হাজার ৫৮৩ জন। এক্ষেত্রে অনেকেই এজেন্ট, মধ্যস্বত্বভোগী (দালাল), মধ্যস্থতাকারী, পেশাদার চোরাচালানকারী এবং অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোর মাধ্যমে বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। অনেকেই দেশে কাজের সুযোগ কমে যাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন প্রচেষ্টার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সেমিনারে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য আতিকুল ইসলাম সভাপতিত্ব করেন। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের ডেপুটি হেড অব মিশন বার্নড স্প্যানিয়ার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক সৈয়দা রোজানা রশীদ, এনএসইউর এসআইপিজির সিনিয়র গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক প্রমুখ। এনএসইউর শিক্ষক ও সিএমএস সদস্য মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন সিকদার ও সেলিম রেজা ওই গবেষণাটি করেছেন। অনুষ্ঠানে নিবন্ধ উপস্থাপন করেন সেলিম রেজা এবং সঞ্চালনা করেন জালাল উদ্দিন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ