jagannathpurpotrika-latest news

আজ, , ১৭ই শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী

সংবাদ শিরোনাম :
«» জগন্নাথপুরে অগ্নিকান্ডে ৩ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি «» জগন্নাথপুর থানার এসআই আতিকুল আলমকে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার সম্মাননা স্মারক ও সনদপত্র প্রদান «» জগন্নাথপুর থানার এসআই অনুজ কুমার দাশকে সুনামগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ এসআই হিসাবে সম্মাননা স্মারক ও সনদপত্র প্রদান «» সুনামগঞ্জে জামেয়া অষ্টগ্রাম শাখাইতির মুমতাজপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ «» জগন্নাথপুর থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী জেলার শ্রেষ্ঠ অফিসার ইনচার্জের সম্মাননা স্মারক ও সনদপত্র পেয়েছেন «» জগন্নাথপুরে পুলিশের অভিযানে ৬ জুয়াড়ি গ্রেফতার «» ৩০ লাখ শহীদকে চিহ্নিত করার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী «» নবীগঞ্জে কৃষকের তালিকায় জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ ও প্রবাসিরা «» লক্ষ্য অর্জনে ছাত্রদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে দারুল ফালাহ’র সবক প্রদান অনুষ্ঠানে- আল্লামা মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী «» দক্ষিণ সুনামগঞ্জে তথ্য সেবা কেন্দ্রের উদ্বোধন 




ইতিহাস ঐতিহ্যে সিলেটের মাইমল সম্প্রদায় : আবদুর রহমান জামী

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার বহির্গামী নাগরিকের হাতে প্রথম বারের মতো যে সবুজ রঙ্গের পাসপোর্টটি ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল তাতে দুইটি দেশ ছিল নিষিদ্ধের তালিকায় এর একটি ইস্রাইল ও অন্যটি দক্ষিণ আফ্রিকা।ইস্রাইলকে নিষিদ্ধ করার কারন অতি সরল।কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিষিদ্ধ করা ছিল অধিক তাৎপর্যপূর্ণ।
সময়ের বিচারে একে এক দুঃসাহসী এবং স্পর্ধিত সিদ্ধান্ত বলে মনে হলেও তাতে ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের মহান স্বপ্ন আর অঙ্গীকার কিন্তু স্বাধীনতার অসাধারণ সব প্রাপ্তির সাথে বিশাল অপ্রাপ্তির জায়গা হলো সব ধরণের বৈষম্য দূরীকরণে নিদারুণ ব্যর্থতা।

 

মানুষে মানুষে ধর্মে ধর্মে সমাজে সমাজে বৈষম্যের দেয়াল ক্রমশঃ উঁচুই হচ্ছে।দরিদ্রের কাছ থেকে ধনী চলে যাচ্ছে স্পর্শাতীত দুরত্বে ধর্মীয় সংখ্যাগুরুদের আগ্রাসনে সংখ্যালঘুরা বিপন্ন জনগোষ্টিতে পরিনত আর সামাজিক সংখ্যাগুরুদের কাছে চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

 

মাইমাল পৃথক কোনও মানব গোত্র বা আদিবাসী উপজাতী নৃগোষ্টির কেউ নয়। এরা এই সমাজেরই একটি অংশ একই বর্ণ একই আকার আকৃতি অভিন্ন ভাষা সংস্কৃতি।ব্যবধান শুধু পেশাতে অর্থাৎ মাইমাল একটি পেশাভিত্তিক সমাজ।

 

 

সিলেটে মুসলমান সমাজ পেশার ভিত্তিতে হিন্দু সমাজের মতো বহুধাবিভক্ত নয় মোটাদাগে বলা যায় দ্বিধাবিভক্ত। এই দ্বিধা বিভক্ত সম্প্রদায় হলো বাঙ্গাল এবং মাইমাল।যাদের বর্তমান বা আদি পেশা মাছধরা বা মাছ বিক্রয় করা তারাই হলেন মাইমাল আর বাদ বাকী সবাই হলেন বাঙ্গাল।আরও স্পষ্ট করে বলা যায় যারা জল আর জালের উপর নির্ভরশীল তারাই জালুয়া বা মাইমাল আর যারা হাল বেয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তারাই হালুয়া বা বাঙ্গাল।

 

 

কিন্তু স্মরণাতীত কাল থেকে পাশাপাশি অবস্থান করা এই দুই সম্প্রদায়ের সম্পর্কের মাঝখানে যে দেয়াল ছিল একাবিংশ শতাব্দীতে এসেও সে দেয়ালে সামান্য চিড়ও ধরেন।
বিশেষ করে সংখ্যাগুরু বাঙ্গাল সমাজের কাছে মাইমাল সম্প্রদায় সেই প্রাথমিক অবস্থা থেকে অবজ্ঞা আর অবহেলাই পেয়ে আসছেন।
যদিও বৃহত্তর বাঙ্গালী মানস গঠনে দুই সম্প্রদায়ের শ্রমলব্ধ ফসল সমান অবদান রেখেছে।হালুয়ার উৎপাদিত ধান বা ভাত আর জালুয়ার ধৃত মাছ খেয়েই গড়ে ওঠেছে ‘মাছে ভাতে বাঙ্গাল’ এর মন ও শরীর। এই নিরিখে দুই পেশাই মহৎ কিন্তু এই দুই পেশাজীবী সমাজ কী করে,আশরাফ-আতরাফ বা উৎকৃষ্ট নিকৃষ্টে বিভাজিত হয়ে গেল তা নির্ণয় করতে হলে শেকড়ে যেতে হবে। একজন মানুষকে বা একটি পরিবারকে একঘরে করে রাখার চেয়ে বড় নিপীড়ন আর কী হতে পারে?এই একাবিংশ শতকে এসেও সামাজিক বর্ণবাদের এই উৎকট প্রকাশ অন্যজেলার মানুষের কাছে বিষ্ময়করই মনে হবে।
আরও বেশী হতাশার ব্যাপার উচ্চ শিক্ষিতেরাও এই ব্যাধি থেকে মুক্ত হতে পারেননি। এত বড় একটি সামাজিক ইস্যু যুগের পর যুগ সরবে এবং সদম্ভে বয়ে চললেও সিলেটের লেখক গবেষকদের লেখায় চিরকালই তা উপেক্ষিত থেকে গেছে।ইসলাম সকল ধর্মান্তরিত মুসলমানকে এক পংক্তিতে স্থান দিয়েছে বলে মোল্লা মৌলভীরা দিবারাত বয়ান ঝাড়লেও সিলেটের মাইমাল সম্প্রদায় কেন পংক্তিভুক্ত নয় এ ব্যাপারে তাদের টু শব্দটিও নেই। মাইমাল সমাজের বিরুদ্ধে বাঙ্গাল সমাজের বড় অভিযোগ এরা আচার আচরনে উগ্র এবং অমার্জিত।‘মাছবাজার’ বাগধারাটি সম্ভবতঃ এই ধারণা থেকেই উদ্ভূত।অভিযোগটি স্থানকাল ভেদে আংশিক সত্য হলেও এর মনস্তাত্ত্বিক কারণটি খতিয়ে দেখা হয়না।একটি সম্প্রদায়কে যুগ যুগ ধরে অন্যায় অন্যায্যভাবে ব্রাত্য করে রাখা হলে তাদের মানসিকতায় একটি স্থায়ী চাপ পড়বেই। মাইমাল সম্প্রদায়বহুল এলাকায় এদের কারো কারো উদ্ধত ও অগ্রহণযোগ্য আচরনের জন্য মাঝে মাঝে সেই অঞ্চলের গোটা সম্প্রদায়কে তার চড়া মূল্য দিতে হয়।আমার জানামতে বৃহত্তর সিলেটের একটি উপজেলায় একাধিকবার এরকম অনাকাংখিত ঘটনা ঘটেছে।একজন ব্যক্তির অন্যায় আচরনের প্রতিক্রিয়ায় গোটা উপজেলার মাইমাল সম্প্রদায়কে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। নিরাপত্তার অভাবে অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রত্যন্ত এলাকায় পালিয়ে যান।খাল বিল জলাশয়ে জেলেদের মাছ ধরা বন্ধ করে দেয়া হয়।রোজ আনা রোজ খাওয়া প্রান্তিক মানুষগুলিকে তখন অবর্ণনীয় দুঃখকষ্টে দিন কাটাতে হয়।অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়লে মাইমাল সম্প্রদায়ের নেতাগণ প্রকাশ্য গণ জমায়েতে অবমাননাকর অবস্থায় নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থণা করে তার অবসান ঘটান।রেকর্ড হিসেবে সেই অবমাননাকর দৃশ্যের ভিডিও পর্যন্ত করে রাখা হয়।মাইমাল সম্প্রদায়ের সাথে সামাজিক বৈষম্য নিয়ে প্রবীন আলেম ও লেখক মৌলানা আব্দুল্লাহ বিন সাইদ জালালাবাদীর লেখা ‘সিলেটের মাইমল সমাজ ; ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও অবহেলিত’ শীর্ষক রচনা থেকে কিঞ্চিত উদ্ধৃত করছি “দেওয়ান-চৌধুরীদের মতো সেই শেরশাহী আমলের অভিজাতদের বর্তমান প্রজন্ম তো বটেই সাধারণ কৃষক ও চাষা-ভূষারাও, যাদেরকে উপর তলার লোকজন ‘কিরান’ বলে উপেক্ষা করেন, তারাও মাইমল বংশোদ্ভুত বা তাদের এলাকাবাসী জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের প্রতি পর্যন্ত কটাক্ষ করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না।এ যুগের উন্নত ও শিক্ষিত পরিবেশে যেখানে উচ্চশিক্ষিত মন্ত্রী ও সচিব পর্যায়ের লোকেরা পর্যন্ত নিজেদের পরিচয় দিতে চাষী ও শ্রমিক নেতা শব্দটি ব্যবহারে গর্ববোধ করেন তখন মাইমল শব্দটি একটি গালিরূপে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ফলে এ সমাজের কোটিপতি, শিল্পপতি, সচিব-যুগ্মসচিব এবং ডক্টরেট করা উচ্চ শিক্ষিত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পর্যায়ের লোকেরা পর্যন্ত হীনম্মন্যতার শিকার হয়ে থাকেন। বংশ-গোত্রপরিচয়ে পরিচিত হওয়াটাকে লজ্জাজনক বিবেচনা করেন”।

 

 

ভুক্তভোগী সমাজের একজন সদস্য হিসেবে জালালাবাদী সাহেব ক্ষোভের বহিপ্রকাশ করতে গিয়ে সাধারণজনের প্রতি ‘চাষাভূষা’ ‘কিরান’ ইত্যাদি হীনতাসূচক শব্দ ব্যবহার করে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে কিছুটা সংকীর্ণতা দোষে দুষ্ট করেছেন বলে মনে হলেও তাঁর লেখার বিষয়বস্তুর সাথে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিমত নেই বরং আমি বলব বাস্তব অবস্থা তার চেয়েও অনেকগুণ খারাপ।আমার মাইমাল সম্প্রদায়ভুক্ত অন্তরঙ্গ বন্ধুগণ যখন আমার বাড়িতে আসতেন তখন সব সময় আমাকে আতংকে থাকতে হতো কখন আমার চারপাশে অবস্থান করা কোনো এক মূর্খ অসভ্য তাদের সমাজ তুলে একটি বাজে উক্তি করে বসে বন্ধুদের সামনে আমার মাথাটি হেঁট করে দেয়।এই অবস্থাটি সিলেটের সর্বত্র।
উদার বৈষম্যহীন মানসিকতার অধিকারী ছাড়া এই রুঢ় বাস্তবতাটি আর কারো পক্ষে উপলব্ধি করাও সম্ভব নয়।দেশেতো বটেই বিদেশে গিয়েও এই সম্প্রদায়ের মানুষের রক্ষে নেই।কর্মক্ষেত্রে শপিং সেন্টারে সর্বত্র তাদের কান দুটিকে বন্ধ করে চলতে হয়।যারা স্বজাতীয় মানুষদের এই বিজাতীয় শব্দপ্রয়োগে বিব্রত বোধ করেন তারা অপেক্ষাকৃত বাঙ্গালমুক্ত এলাকাই বসবাসের জন্য বেছে নেন।

 

 

লালন বলে জাতের কি রূপ…

ষোঢ়শ সপ্তদশ শতাব্দীর স্পেনিশ লেখক মিগুয়েল ডি কারভেন্তেসের ‘ডন কুইক্সট’ উপন্যাসটি যারা পড়েছেন তারা জানেন নিজেকে সহসা অসাধারণ এবং অন্যকে ইতর ভাবা একটি মানসিক সমস্যা যা মানুষকে এক সময় বদ্ধ উন্মাদ করে দিতে পারে।
বৃহত্তর সিলেটের ডন কুইক্সট সিম্পটম আক্রান্তদের উচিৎ জাত বর্ণের আদি ইতিহাসটি জেনে নেয়া তাহলে এই মানসিক কমপ্লেক্স থেকে এরা মুক্তি পেলেও পেতে পারেন।
বাঙ্গালী বর্ণপ্রথার উত্তরাধিকার লাভ করেছে আর্যদের মাধ্যমে।প্রাচীন আর্য সমাজ ব্রাহ্মণ ক্ষত্রীয় বৈশ্য ও শূদ্র এই চার বর্ণে বিভক্ত হলেও অনেক দৃষ্টান্ত থেকে দেখা যায় শুরুতে এই বর্ণগুলি বংশ পরম্পরাগত ছিলনা অর্থাৎ ব্যক্তির কর্মগুণে তার বর্ণ নির্ধারিত বা পরিবর্তিত হতো তার মানে ব্রাহ্মণের সন্তান জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণ হওয়ার সুযোগ ছিলনা তেমনি শুদ্রের সন্তান শূদ্র হিসেবেই পরিচিতি পাবে তেমনটিও ছিলনা।
শূদ্রের সন্তানও ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় হয়েছে আবার ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয়ের সন্তানও শূদ্র হয়েছে। যেমন ঋষি ঐতরেয়া ছিলেন দাসপুত্র তিনি ব্রাহ্মণ হয়েছিলেন এবং ‘ঐতরেয়া ব্রাহ্মণ’ ও ‘ঐতরেয়াপোনিষদ’ রচনা করেন।
সত্যকাম জাবাল ছিলেন এক পতিতার সন্তান তিনি ব্রাহ্মণ হন, প্রীষধ ছিলেন রাজা দক্ষের পুত্র তিনি শূদ্র হন।নবগ রাজা নেদিস্থের পুত্র, হন বৈশ্য আবার তার অনেক পুত্র ক্ষত্রিয় হয়ে যান।ধৃষ্ট ছিলেন নবগের পুত্র তিনি ব্রাহ্মণ হন আবার তার পুত্র হয়ে যান ক্ষত্রিয়।মাতঙ্গ জন্মেছিলেন চন্ডালের ঘরে কিন্তু তিনি ব্রাহ্মণ হন।এ রকম বর্ণ থেকে বর্ণান্তরে পরিবর্তনের অনেক দৃষ্টান্ত আছে পরিসর সীমিত রাখার জন্য কয়েকটি মাত্র উদ্ধৃত করলাম।যতদিন বর্ণ থেকে বর্ণান্তরে উন্নয়ন বা অবনমনের ধারাটি চালু ছিল ততদিন পর্যন্ত এই বর্ণপ্রথায় খারাপ কিছু ছিলনা বরং বলা যায় এটি ছিল সময়ের বিচারে একটি আধুনিক এবং আদর্শ ব্যবস্থা কেননা এ ব্যবস্থায় ব্যক্তি সত্তাকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি ব্যক্তি উৎকর্ষতাকেও উৎসাহিত করা হয়েছে কিন্তু কালক্রমে এই আদর্শ ব্যবস্থা যখন বংশ পরম্পরাগত মৌরসি উত্তরাধিকারে রূপান্তরিত হলো সাথে সাথেই এর বিভৎস উল্টোপিঠও সক্রীয় হয়ে উঠল।শুরু হলো সামাজিক বৈষম্যের তথা জাত্যাভিমান এবং ঘৃণ্য বর্ণভেদ প্রথার।আর্যরা যখন অনার্য দ্রাবিড় অসুরদের তথা আমাদের পূর্বপুরুষদের সংস্পর্শে আসে তখনই সম্ভবতঃ বর্ণান্তরে গমনের সচল চাকাটি থেমে যায়।

 

 

বিজয়ীরা বিজিত থেকে শ্রেষ্টতর এই চিরন্তন জাত্যাভিমান থেকে সেরা তিন বর্ণ নিজেদের জন্য রেখে শূদ্র শ্রেণীটি বিজিতদের জন্য বরাদ্ধ করে দেয়।এটাও ইতিহাসের অনিবার্য ধারা। কোনও বিজয়ী জাতি বিজিতকে নিজেদের সমান পংক্তিতে বসিয়েছে এমন উদারতার নজীর বোধ হয় ইতিহাসে খুব একটা পাওয়া যাবেনা।আর্যদের মতো বিজয়ী মুসলমানরাও স্থানীয়দের প্রতি একই আচরন করেছে।

 

 

উপমহাদেশের অন্যান্য বিজিত অনার্যের মতো বাঙ্গালীর শুদ্রত্বও স্থায়ী রুপ লাভ করে।পাল আমল পর্যন্ত বাঙ্গালীর একটি বর্ণ বৈষম্যহীন সমাজ ছিল বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু অবাঙ্গালী সেন রাজাদের সময়ে সেই বর্ণ বৈষম্যহীন সমাজকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়।সমাজ স্পষ্টতঃ অভিজাত ও ইতর এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।
উৎপাদক শ্রেণী পরিনত হল ইতর শ্রেণীতে আর উৎপাদন ভোগকারী প্যারাসাইটরা হয়ে গেল কুলীন শ্রেণীভুক্ত।যদিও প্রথমে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছিল প্রজাদের সৎ পথে পরিচালিত করতেই এই কৌলিন্য প্রথার সৃষ্টি এবং নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে প্রজাদের জীবনধারা পর্যালোচনা করে কুলীন অকুলীন পুনর্মূল্যায়ন করা হবে কিন্তু কৌলিন্য প্রথার প্রবর্তক স্বয়ং বল্লাল সেনই প্রবর্তিত নিয়ম ভঙ্গ করে রাজতোষণকে মাফকাঠি ধরে কৌলিন্য নির্ধারণ করতে শুরু করেন।এ কাহিনীটিও বেশ কৌতুহলোদ্দীপক।
আনন্দভট্ট রচিত বল্লালসেন এর জীবনীমুলক কাব্য ‘বল্লাল চরিত’ থেকে জানা যায় রাজা বল্লালসেন বৃদ্ধ বয়সে পত্নী থাকা সত্ত্বেও এক ষোড়শী চর্মকার কন্যাকে বিয়ে করে প্রবল সমালোচনার মুখোমুখি হন।প্রজাদের মুখ বন্ধ করার জন্য রাজা অবশেষে এক ভোজের আয়োজন করেন যাতে ভুরিভোজের সাথে সাথে উপস্থিতদের মাঝে কৌলীন্য বণ্টনেরও ব্যবস্থা রাখা হয়।রাজার এই চাতুর্যপূর্ণ কৌশলটি আশাতিরিক্ত সাড়া ফেলে।রাজ ভোজ আর জাত সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় বাঙ্গালী দলে দলে সেই ভোজ সভায় যোগদান করে এবং রাজার অসবর্ণ তরুণী ভার্যা গ্রহণকে তিরস্কারের বদলে প্রশংসনীয় কাজ বলেই স্বীকৃতি দেয়।যে যত স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে রাজার অনৈতিক কাজকে প্রশংসিত করেছেন চাটুকাবৃত্তির মাত্রানুসারে নিজ কুলকে ততখানিই উপরে তুলতে সমর্থ হন।
বল্লালসেনের মোসাহেবি করে অনেকে যেমন জাত কামিয়েছেন তেমনি তার রোষাণলে পড়ে অনেকে জাতিভ্রষ্টও হয়েছেন।যেমন রাজার কৌলিন্য বণ্টন অনুষ্টান বর্জন করে বৈদিক ব্রাহ্মণেরা জাতিভ্রষ্ট হন।আবার বল্লভানন্দ নামক জনৈক ধনাঢ্য সুবর্ণবণিক রাজাকে যুদ্ধার্থে ঋণ প্রদানে অনীহা প্রকাশ করলে রাজা ক্রুদ্ধ হয়ে গোটা সুবর্ণ বণিক জাতিকেই পতিত করেন এবং তাদেরকে নানাভাবে নিপীড়ন করেন।বল্লাল চরিত থেকে এখানে বিভিন্ন শংকর জাতি উৎপত্তির কিছু বিবরণ উদ্ধৃত করা হলো।

 

 

“বৈশ্যের গর্ভে শূদ্রের ঔরষে তৈলকার জাতির উৎপত্তি হয়।বৈশ্যের ঔরষে শূদ্রকন্যার গর্ভে কন্দুক জাতির, কন্দুকের ঔরষে ব্রাহ্মণীর গর্ভে কল্লপাল জাতির, শূদ্রের ঔরষে ক্ষত্রিয়া বৈশ্যা ও ব্রাহ্মণীর গর্ভে যথাক্রমে আয়গব, বৈণ ও নরাধম চন্ডাল জাতির, শূদ্রা জাতির গর্ভে কুম্ভকারের ঔরষে পলগন্ডক জাতির, কুম্ভকার কন্যার গর্ভে শূদ্রের ঔরষে মালাকার জাতির, ক্রয়ক্রীত কন্যার গর্ভে দাস জাতির, ব্রাহ্মণের ঔরষে শূদ্রকন্যার গর্ভে নাপিত জাতির, হতভাগ্য ব্রাহ্মণ কন্যার গর্ভে শূদ্র বৈশ্য ও ক্ষত্রিয়ের ঔরষে চন্ডাল, কিরাত ও ভড় জাতির যথাক্রমে উৎপত্তি।বিভিন্ন জাত সৃষ্টির লম্বা ফর্দ থেকে বাছাই করা এই সংক্ষিপ্ত তালিকাতে দেখা যায় তথাকথিত উচ্চ বর্ণের ঔরষে ও নীচ বর্ণের গর্ভে তূলনামুলক ভাল জাতের সৃষ্টি হয়েছে আবার নীচ জাতের ঔরষে উচ্চ বর্ণের গর্ভে ব্রাত্য জাতিগুলির সৃষ্টি হয়েছে।
বল্লালচরিতে এর ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে এরকম “ক্ষেত্র ও বীজ ভেদে কখন ক্ষেত্রের উৎকর্ষে কখন বা বীজের উৎকর্ষে জাতি উচ্চ বা নীচ হইয়া থাকে, কখন বা অনুলোমানুসারে জাতি মাতৃজাতির তুল্য হইয়া থাকে।গুণানুসারে কখন অনার্য কন্যার গর্ভে আর্য জাতির ঔরষে উৎপন্ন জাতি আর্য্য হয় কখন বা আর্য্যকন্যার গর্ভে অনার্য্যের ঔরষে জাত জাতি অনার্য হইয়া যায়।“উপরের বর্ণনাকে যদি আমরা একটি এনিমেল ব্রিডিং সেন্টারের বা পশু খামারের ক্রস ব্রিডিং পদ্মতির সাথে তুলনা করি তবে তা খুব বেমানান মনে হবে কি ? ব্রিডিং ষ্টকের উঁন্নত ষাঁড়ের বীজ দিয়ে যেভাবে হাইব্রীড শংকর জাতি উৎপন্ন করা হয় তেমনি যেন উন্নত আর্য্যবীর্যে বাঙ্গালীর তথাকথিত উচ্চ বর্ণগুলির সৃষ্টি হয়েছে।আরও হাস্যকর ব্যাপার হলো শূদ্র বাঙ্গালীর মাঝে ভেদ সৃষ্টির লক্ষ্যে শূদ্রকে ভাগ করা হলো সৎ শূদ্র ও অসৎ শূদ্রে। সাধারনতঃ সৎ অসৎ নির্ণয় হয় ব্যক্তির চরিত্রগুণে কিন্তু আর্যদের বেঁধে দেয়া বিধানানুসারে কেউ জন্মই নেয় সৎ বা অসৎ হিসেবে। সেই অনিবার্য ধারা আজও চলছে। লেখক: দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, মোবাইল 01712 531125

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ