jagannathpurpotrika-latest news

আজ, , ১২ই রজব, ১৪৪০ হিজরী

সংবাদ শিরোনাম :




কর্মমুখী জীবন : প্রসঙ্গ ইসলাম

হাফিজ মাওলানা অধ্যক্ষ সৈয়দ রেজওয়ান অাহমদ ::

 

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম ইসলাম। যে ধর্মের প্রতিটি বিধানের মূলে রয়েছে কর্ম ও কর্ম তৎপরতা। যদিও অনেকরই এ ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে একে ‘পরকালমুখী কর্মবিমুখ ধর্ম’ হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন, কিন্তু ইসলামের বিধান পর্যালোচনা করলে একে বাস্তববাদী ও কর্মমুখী ধর্ম বলেই প্রতিয়মান হয়। আল-কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে উত্তম জাতি হিসেবে উল্লেখ করে তাদেরকে সৎ কর্মের আদেশ ও অসৎ কর্মের নিষেধ প্রদান করেছেন। ইসলামী বিধানে দুনিয়াকে আখেরাতের “কর্মক্ষেত্র” উল্লেখ করে তার অনুসারীদের উত্তম কর্মের মাধ্যমে উভয় জগতের কল্যাণ সাধনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল-কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা কর্ম, মালিক-শ্রমিকের বৈশিষ্ট্য ও পারিশ্রমিকের বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা পৃথিবীকে মানুষের জীবিকা অন্বেষণের জন্য সুগম করে দিয়েছেন। যাতে করে তারা জলে, স্থলে পরিভ্রমণ করে তাদের আহার্যের সন্ধান করতে পারে। ইসলাম বৈরাগ্যবাদী কোন ধর্ম নয়, এ জীবন-বিধানে বলা হয়েছে যে, রুযীর তাগিদে মানুষকে দেশ-দেশান্তরে ভ্রমণ করার প্রয়োজন হতে পারে, তাই তাদের জন্য আল্লাহ তাআলা ইসলামের বিধি-বিধানও সহজ করে দিয়েছেন।এ প্রসঙ্গে আল-কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, “কাজেই আল-কুরআনের যতটুকু তোমাদের জন্য সহজ, ততটুকু(রাতের নামাজে) আবৃত্তি কর। তিনি (আল্লাহ) জানেন তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হবে, কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে দেশে-বিদেশে যাবে এবং কেউ কেউ আল্লাহর পথে জিহাদে লিপ্ত হবে। কাজেই কোরআনের যতটুকু তোমাদের জন্য সহজ ততটুকু আবৃত্তি কর”(আল কুরআন-৭৩:২০)।

 

রাসুল সা. কর্মের দ্বারা রুজি উপার্জনকে ফরজ ইবাদত হিসেবে গণ্য করেছেন এবং শ্রম বা কর্ম দ্বারা অর্জিত খাদ্যকে সর্বোৎকৃষ্ট খাদ্য হিসেবে উল্লেখ করে বাস্তবতানুযায়ী কর্মের শিক্ষা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মহা নবী সা. বলেছেন, তোমাদের কারও পক্ষে এক বোঝা জ্বালানি সংগ্রহ করে পিঠে বহন করে নিয়ে আসা কারও কাছে সওয়াল করার চেয়ে উত্তম। কেননা অনেক সময় সওয়াল করলে সে দিতেও পারে আবার নাও পারে।” (হাদীস শরীফ)

 

ইসলামী বিধানে প্রাত্যহিক কাজকর্ম থেকেও আধ্যাত্মিক কল্যাণের সুযোগ রয়েছে। এ বিধানে জীবিকা নির্বাহের জন্য আয়-উপার্জনকে আল্লাহর পথে জিহাদ বলে উল্লেখ করেছে এবং সকল ধরনের কায়িক বা শারীরিক শ্রমকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের যথাময়ে নামাজ আদায়ের পরপরই তাঁর দেয়া নেয়ামতরাজী থেকে কর্মের দ্বারা অনুগ্রহ তালাশের নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আল-কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে “অতঃপর নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ কর”(আল কুরআন-৬২
:১০)।

 

ইসলাম স্বহস্তে কর্মকে উৎসাহিত করে সম্মানজনক ও আত্মতৃপ্তি মূলক জীবিকার ব্যবস্থা করেছে এবং একে শ্রেষ্ঠ জীবিকা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এক সাহাবী রাসুল সা. এর কাছে আর্থিক সাহায্য চাইলে তিনি তার(সাহাবী) শেষ সম্বল কম্বল ও বাটি বিক্রি করে তা দিয়ে কুঠার কিনতে বলেন এবং তিনি (রাসূল সা.) নিজ হাতে কুঠারের হাতল লাগিয়ে সেই সাহাবীকে জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে তা বাজারে বিক্রি করে কর্মমুখী জীবন নির্বাহের ব্যবস্থা করে দেন। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, মিকদাম রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, নিজ হাতের শ্রমে উপার্জিত জীবিকার চেয়ে উত্তম আহার কেউ কখনও গ্রহণ করেনি। আল্লাহর নবী দাউদ আ. নিজ হাতে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন(সহীহ বুখারী)।

 

নবী ও রাসুলগণও স্বহস্তে কর্ম করতেন এবং শেষ রাসুল মুহাম্মদ সা. নিজে সবসময় কর্মব্যস্ত থাকতেন এবং সাহাবাদেরকেও কাজ করে জীবিকা উপার্জনের উৎসাহ দিতেন। এমনকি কাজ করার কারণে তাঁর হাতে ফোস্কা পড়ে যেত, সে হাত দেখিয়ে তিনি বলতেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল এরূপ শ্রমাহত হাত খুবই পছন্দ করেন ও ভালবাসেন। সাহাবাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে তাদের শরীর থেকে ঘামের গন্ধ বের হতো এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূল সা. এর সাহাবীগণ নিজেদের কাজ-কর্ম নিজেরা করতেন। ফলে তাদের শরীর থেকে ঘামের গন্ধ বের হতো। সেজন্য তাদের বলা হলো, যদি তোমরা গোসল করে নাও (তবে ভালো হয়) (সহীহ বুখারী)।

 

ইসলাম কর্মে উৎসাহিত করার পাশাপাশি অলসতা দূর করার নির্দেশনা দিয়েছে। কেননা অলসতাই কাপুরুষতা, ভীরুতা ও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ করে। আর এজন্যই ইসলামী বিধানে যাদেরই কর্মশক্তি রয়েছে তাদের প্রত্যেককে সামর্থনুযায়ী কর্মের নির্দেশনা দিয়েছে। কর্মের প্রতি উৎসাহদানের পাশাপাশি এ বিধানে কর্মজীবীদের কর্মঘন্টা, কর্মপরিবেশ ও পারিশ্রমিক প্রাপ্তির নিশ্চয়তাসহ তাদের সকল অধিকার বাস্তাবায়নেরও নির্দেশনা দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ সা. অধীনস্থদের নিজেদের ভাই হিসেবে উল্লেখ করে তাদের অধিকারের ব্যাপারে শতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদের ওপর সাধ্যাতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপিয়ে দিতেও নিষেধ করেছেন। ইসলাম শ্রমিকের পারিশ্রমিক তার ঘাম শুকানের পুর্বেই প্রদানের নির্দেশনা দিয়েছে এবং তা প্রদানে টালবাহানা করলে তার জন্য কঠিন শাস্তির ঘোষণা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসূল সা. বলেনে, “মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন আমি নিজে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হবো। এক ব্যক্তি, যে আমার নামে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে। আরেক ব্যক্তি, যে কোনো আযাদ মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করল। আর এক ব্যক্তি, যে কোন মজুর নিয়োগ করে তার থেকে পুরো কাজ আদায় করে এবং তার পারিশ্রমিক দেয় না (সহীহ বুখারী)।

 

ইসলাম বেকার যুবকদের কর্মমুখী করা ও অনাবাদি জমির সঠিক ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ প্রসঙ্গে রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, সমস্ত যমীনই আল্লাহর এবং বান্দারা সবাই আল্লাহর বান্দা।

 

লেখক: অধ্যক্ষ, সৈয়দপুর ফাজিল মাদ্রাসা, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ