jagannathpurpotrika-latest news

আজ, , ১২ই রজব, ১৪৪০ হিজরী

সংবাদ শিরোনাম :




বাংলাদেশ-সৌদি ছয় চুক্তি-সমঝোতা সই

ডেস্ক রিপোর্ট :: ইতিহাসে এই প্রথম সৌদি আরবের দু’জন প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং দু’জন উপ-মন্ত্রীসহ ৩৫ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের বিনিয়োগ প্রতিনিধি দল একসঙ্গে ঢাকা সফর করলেন। কয়েক ঘণ্টা ঝটিকা সফরে সৌদি প্রতিনিধি দলের সদস্যরা রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও দিনব্যাপী ঢাকায় দ্বিপক্ষীয় এক বিনিয়োগ সভায় অংশ নিলেন। সেখানে ঢাকার তরফে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব সৌদি নেতৃত্বের বিবেচনায় উপস্থাপন করা হয়। সৌদি আরবের তরফে ঢাকার প্রায় সব প্রস্তাবে তাৎক্ষণিকভাবে সায় দিয়ে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে একটি যৌথ কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। সৌদি সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী ওই কমিটির নেতৃত্ব দেবেন এবং সেখানে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ, পরিকল্পনা, বাণিজ্য, পররাষ্ট্রসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা অন্তর্ভুক্ত থাকছেন। এদিকে সৌদি দুই মন্ত্রী এবং অন্যদের সঙ্গে আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে তার দপ্তরে ২টি চুক্তি এবং ৪টি সমঝোতা স্মারক মোট ৬টি ডকুমেন্ট সই হয়েছে।

বিনিয়োগ বিষয়ে নিয়ে যা বললেন সৌদি নেতৃত্ব: এদিকে ঢাকার বিনিয়োগ সভায় সৌদি আরবের প্রতিনিধি দলের প্রধান মাজিদ বিন আবদুল্লাহ আল  কোসাইবি বলেন, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্কে ‘নতুন অধ্যায়ের’ সূচনার লক্ষ্য নিয়ে এসেছেন তারা। বুধবার মধ্যরাতে ঢাকা আসার পর বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল  হোটেলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংলাপে অংশ নেন  সৌদি আরবের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ মন্ত্রী মাজিদ। সৌদি আরবের বিশাল প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে দুইদেশের মধ্যে বাণিজ্য সমপ্রসারণ, আলোচনা ও যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং একটি নতুন অধ্যায় সূচনার বিষয়ে আমরা যে আন্তরিক তারই প্রমাণ আমাদের প্রতিনিধি দলের বিশালত্ব।

সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বাংলাদেশকে ‘সত্যিকার এশিয়ার বাঘ’ বলে অভিহিত করেন বলে জানান তিনি। প্রতিনিধি দলে সৌদির অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মোহাম্মদ বিন মেজয়েদ আলতাইজরি, সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের প্রতিনিধি এবং দেশটির শীর্ষস্থানীয় ১৭টি ব্যবসায়ী গ্রুপের প্রতিনিধি ছিলেন।

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এবং প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানও বক্তব্য দেন। সৌদির বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আপনাদের এই নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, আমরা এখানে এসেছি সহযোগিতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন খাতে এগোনো, আপনাদের কথা শোনা এবং সহযোগিতার নতুন নতুন সুযোগগুলো বের করতে। আমরা এখানে এসেছি সংলাপ শুরু করতে এবং রিয়াদে পরবর্তী ধাপের সংলাপে আপনাদের আমন্ত্রণ জানাতে। দুই দেশের সরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে যেসব কাজ করা যায়, সেগুলো তারা খুঁজে বের করতে চান বলে জানান এই সৌদি মন্ত্রী। বাংলাদেশের অর্জনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের উপর আস্থা রাখি। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব রয়েছে। সৌদি আরবে কর্মরত ২০ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক অংশীদার হিসেবে তাদের দেশ গঠনে ভূমিকা রাখছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। মাজিদ বলেন, ‘বাস্তবে এটা নতুন সৌদি আরব। বাস্তবে এটা নতুন বাংলাদেশ।

প্রকৃত অর্থে সংলাপ একটি দ্বিমুখী পথ এবং আমরা এই সম্পর্ক বৃদ্ধিতে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ শুরু করেছি। কারণ আপনি যদি আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দেখেন, তা এখনও কম যদি সামপ্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে তা বেড়েছে। তিনি বলেন, ১৪০ কোটি ডলারের বাণিজ্য সীমিত এবং তাতে আমাদের দুই দেশের সম্পর্ক ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে না। তিনি বাংলাদেশ- সৌদি আরব বিজনেস কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করেন। সৌদি মন্ত্রী বলেন, আমরা ২০৩০ সাল নাগাদ ভিশন ঠিক করেছি। বাংলাদেশ করেছে ভিশন-২০২১ ও ২০৪১। দিন শেষে এই ভিশন একটাই বার্তা দেয়, আমাদের উভয়কেই কাজ করতে হবে এবং উভয়পক্ষের স্বার্থের দিকগুলো বের করতে হবে যাতে একে-অপরের উপকারে আসবে।’ অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, এই সংলাপ থেকে উভয়পক্ষের জন্য ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত আসার অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশের জনগণ। এই সফর ভ্রাতৃপ্রতীম দুই দেশের উষ্ণ, গভীর ও সময়ের পরীক্ষিত সম্পর্কের প্রতিফলন। গতবছর সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের থেকে বাংলাদেশে ২৬০ কোটি ডলার রেমিটেন্স এসেছে, যা মোট রেমিটেন্সের ১৮ শতাংশ।

দুই চুক্তি, চার সমঝোতার বিস্তারিত:ওদিকে বিদ্যুৎ ও জনশক্তিসহ কয়েকটি খাতে বিনিয়োগের জন্য সৌদি আরবের সঙ্গে দু’টি চুক্তি ও চারটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে; যার মাধমে দেশে বড় ধরনের বিদেশি বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে তার কার্যালয়ে সৌদি প্রতিনিধিদের সঙ্গে এসব চুক্তি ও সমঝোতায় সই করেন বাংলাদেশের বিভিন্ন কোম্পানি ও সংস্থার প্রতিনিধিরা। চুক্তি সইয়ের আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে  বৈঠক করেন সৌদি আরবের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ক মন্ত্রী মাজিদ বিন আবদুল্লাহ আল কাসাভি এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী মোহাম্মদ বিন মাজিদ আল-তাওজরি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম পরে সাংবাদিকদের বলেন, সৌদি বাদশাহ্‌ বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে আগ্রহী বলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ মন্ত্রী মাজিদ বৈঠকে জানান। সৌদি আরবের ৩৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে বুধবার রাতে ঢাকায় পৌঁছান দেশটির দুই মন্ত্রী। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী এম আমিনুল ইসলাম বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, সৌদি প্রতিনিধি দলের এই সফরে অন্তত ১৬টি প্রকল্পে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ আসবে বলে তারা আশা করছেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌদি প্রতিনিধি দলের বৈঠক বিষয়ে প্রেস সচিব জানান, তাদের স্বাগত জানিয়ে দুই দেশের ঐতিহ্যগত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন বলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আমাদের দেশকে উন্নত করতে চাই। জায়গা কম হলেও আমাদের জনসংখ্যা প্রচুর।” বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে বিনিয়োগকারীদের জমি দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের বিরাট অভ্যন্তরীণ বাজারের কথাও তিনি তুলে ধরেন। লালমনিরহাটে এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় করা হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বলেন, এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে আইন পাস করা হয়েছে। এ সময় অন্যদের মধ্যে অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন, পরিকল্পনামন্ত্রী আবদুল মান্নান, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী এম আমিনুল ইসলাম বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

ইন্টারকন্টিনেন্টালে অর্থমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন: এদিকে বিনিয়োগ সভার পর রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল বলেন, সৌদি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তারা আমাদের চাহিদা জানতে চেয়েছে। আমরা বেশ কয়েকটি প্রকল্পের কথা বলেছি। এরমধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ট্রেন, ঢাকা-বরিশাল ট্রেন লাইনসহ আরও কয়েকটি প্রকল্প। আমরা তাদের কাছে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের কথা বলেছি। তারা সঙ্গে সঙ্গে এ নিয়ে একটি কমিটি করার প্রস্তাব করলেন। সৌদির অর্থ ও পরিকল্পনা মিনিস্টার থাকবেন সেই কমিটির প্রধান। নাম হবে সৌদি-বাংলাদেশ জয়েন্ট ওয়ার্কিং কমিটি ফর ইনভেস্টমেন্ট। এ কমিটিতে আমাদের পক্ষ থেকে কয়েকজন মন্ত্রী থাকবেন। তারা দ্রুত আমাদের প্রজেক্টগুলো নিয়ে স্টাডি করবেন। এবং তাদের মতামত আমাদের জানাবেন। আমি আশ্বস্ত যে, দ্রুত আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, যার কাছে ফান্ড তিনি যেহেতু এই কমিটির প্রধান সেহেতু আমরা দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারব। প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

সৌদি আরব বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী: সৌদি আরব বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। সৌদি সরকার দু’দেশের মধ্যে ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে কাজ করছে। সৌদি আরবের দু’জন মন্ত্রীর নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গতকাল বিকালে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতে এ আগ্রহের কথা জানান। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের পরই তার রিয়াদের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ