jagannathpurpotrika-latest news

আজ, , ২১শে শাবান, ১৪৪০ হিজরী

সংবাদ শিরোনাম :
«» বালাগঞ্জে খেলাফত মজলিসের মিসবাহকে সভাপতি ও অফিককে সেক্রেটারি নির্বাচিত করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন «» জগন্নাথপুরে স্কুল ছাত্রী ধর্ষণে ধর্ষক গ্রেফতার «» হবিগঞ্জে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন «» ড. রেজা কিবরিয়া হচ্ছেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক «» দক্ষিণ সুনামগঞ্জে অবৈধস্থাপনা উচ্ছেদ «» বালাগঞ্জে ছাত্রদল নেতা জাকারিয়াকে বিদায় সংবর্ধনা প্রদান «» একজন মোকাব্বির খান ও বিএনপির সংসদে যোগদান : মুক্তাদীর অাহমদ মুক্তা «» জগন্নাথপুরে পলাতক আসামি গ্রেফতার «» জগন্নাথপুরে বিএনপি নেতা মঞ্জুর কবিরীর মৃত্যুতে শোক সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত «» সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের মেয়াদ উত্তীর্ণ : নতুন কমিটি গঠনের দাবি




স্বাধীনতা সংগ্রামে আলেম সমাজের ভূমিকা : একটি পর্যালোচনা- (শেষ) :: অধ্যক্ষ সৈয়দ রেজওয়ান আহমদ

স্বাধীনতা সংগ্রামে আনেক আলেম সম্মুখ সমরে অগ্রগামী হয়ে আহত হয়েছেন, আনেক শাহাদত বরণ করেছেন এমন আলেমের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।

মুক্তিযুদ্ধের লেখা থেকে দুই-একটি উদাহরণ পেশ করছি।
তিনি লিখেছেন, একইভাবে তারা রাজবাড়ী জেলখানার মাওলানার কাজী ইয়াকুব আলীকে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধারা বিহারিদের রাজবাড়ী জেলখানায় আটক করার পর মাওলানা কাজী ইয়াকুব আলী তাদের পাকিস্তানপ্রীতি ত্যাগ করে জয় বাংলার প্রতি সমর্থন জানানোর চেষ্টা করেছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী রাজবাড়ী দখলের পর বিহারীরা ছাড়া পেয়ে মাওলানা ইয়াকুব আলী আলীকে হত্যা করে। এপ্রিলের শেষ দিকে ইয়াকুব আলী কাজী কান্দাস্থ নিজবাড়ী থেকে শহরাভিমুখে আসার পথে অবাঙালীরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। মাওলানা কাজী ইয়াকুব আলীকে বিহারীরা গলা কেটে হত্যা করে। তারপর তাঁর পেটের মাঝখানে পাকিস্তানি পতাকা পুঁতে নিয়ে বলে “আভি শালা জয় বাংলা বলো” ।

মুক্তিযুদ্ধের কথা বলব অথচ ওলামায়ে কেরামের কথা বলব না, তা হয় না। অবশ্যই স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের অবদানের বিষয়টি স্বতন্ত্রভাবে সংরক্ষিত হতে হবে। তা না হলে ইতিহাসটি এক মহান দায় চিরদিন আমাদের কাঁদে থেকে যাবে। এখন ও বহু মুক্তিযুদ্ধা বেঁচে আছেন। বেঁচে আছেন মুক্তিযুদ্ধকে কাছ থেকে দেখা সে সময়ে পূর্ণবয়স্ক ও বুদ্ধিসম্পন্ন বহু নাগরিক, কোরো ধরণের ব্যাখ্যা ছাড়া তারা বাংলাদেশকে ভালোবাসেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গর্ব করেন। তাঁদেরকে স্মরণ করা সকলের দায়িত্ব বলে মনে করি।

দেশের বিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়া ও স্বাধীনতার সংশ্লিষ্টতা –

চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার অন্তর্গত ‘জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়া মাদ্রাসা’ যা মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিশ্চিত হয় পটিয়া মাদ্রাসার আলেমরা মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছেন, তখনই পটিয়া মাদ্রাসার উপর জঙ্গি বিমান দিয়ে বোমা বর্ষণ শুরু করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এই বোমা বর্ষণে পটিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক আস্তামা দানেশ ও কারী মাওলানা জেবুল হাসানসহ অনেকেই শহীদ হন। ১৯৭১ সালে এপ্রিল মাসে মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের যন্ত্রপাতিনিয়ে পটিয়া মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁকে আশ্রয় দেয়ার অপরাধে পটিয়া মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষককে হত্যা করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। বোমা মেরে গুড়িয়ে দেয় মাদ্রাসার একাধিক ভবন।

যুদ্ধকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূত আগা শাহীর সাক্ষাৎকার :
আগা শাহীর সাক্ষাৎকারটি মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল এবিসির মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিল। এই সাক্ষাতকারে সাংবাদিক বব ক্লার্কের এক প্রশ্ন থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, আলেম সমাজ মুক্তিযুদ্ধে জনগণের পাশে ছিলেন এবং সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। আগা শাহী যখন পূর্বপাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচারে গণহত্যা,লুটপাট ও ধক্ষংসযজ্ঞের অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন, তখন তার প্রতি বব ক্লার্কের প্রশ্ন ছিল,জনাব রাষ্ট্রদূত, গণহত্যার অভিযোগ কিন্তু নানা সূত্র থেকে এসে পৌঁছেছে। এসব সূত্র হচ্ছে বিদেশী কূটনীতিবিদ, ধর্মপ্রচারক ও সাংবাদিক। এরা কিন্তু আপনাদের সশস্ত্র ব্যবস্থা গ্রহণের আগে থেকেই ঘটনাস্থলে ছিল। পাকিস্তান থেকে সীমান্তের ওপারে যেসব শরণার্থী চলে গেছে, তাদের বক্তব্যের সঙ্গে এদের গণহত্যার বিবৃতির মিল থাকাটা কি অর্থবহ নয়?

আলেম সমাজ যে শুধু যুদ্ধের সময় সহযোগিতা করেছেন তা নয়, বরং ১৯৪৭ সালে ইংরেজরা ভারত-পাকিস্তান ভাগ করে চলে যাওয়ার সময় যখন নেতারা একটা স্বাধীন রাষ্ট্রপ্রাপ্তির সাফল্যে সন্তুষ্ট তখন একজন আলেম পূর্ব-পশ্চিমের এ সংযুক্ত বিভাগকে মেনে নিতে পারেননি। তিনি প্রকাশ্যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধিতা করতে থাকেন এবং এ ভুখণ্ডের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী তোলেন। তিনিও ছিলেন একজন মাওলানা।

একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘জমিয়তে উলামা হিন্দ’-এর ভূমিকা
ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসা কেন্দ্রিয় আলেমদের সংগঠন ‘জমিয়তে উলামা হিন্দ’-এর নেতৃবৃন্দ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অনেক ফতোয়া, বিবৃতি দিয়েছিলেন। ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনের বীর সিপাহসালার শায়খুলইসলাম সাইয়েদ হোসাইন আহমদ মাদানীর সুযোগ্য সন্তান ভারতীয় কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট মেম্বার এবং ‘জমিয়তে উলামা হিন্দ’-এর সংগ্রামী সভাপতি মাওলানা সাইয়েদ আসআদ মাদানী, পশ্চিমবঙ্গ ‘জমিয়তে উলামা হিন্দ’-এর সভাপতি মাওলানা মুহাম্মদ তাহের প্রমুখ বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে বার বার ছুটে গিয়েছেন, নগদ অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দেশ-বিদেশে জনমত সৃষ্টিতে তাঁরা জোড়ালো ভূমিকা রেখেছেন।

পাকিস্তানিদের স্বাক্ষ্য
পাকিস্তান পিপলস্ পার্টির নেতা তারেক ওয়াহিদ বাট তাঁর বইয়ে উল্লে খ করেছেন, পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মুফতি মাহমুদ সাহেবের বক্তব্য সব সময় বাঙালী মুসলমানদের পক্ষে ছিল। এ কথার সত্যতা পাওয়া যায় সিলেটের জকিগঞ্জ এলাকার মাওলানা আব্দুস সালামের কথায়। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে আমি করাচি ইউসুফ বিন্নুরী মাদ্রাসার ছাত্র। একদিন মুফতী মাহমুদ সাহেব মাদ্রাসায় এলে তাঁকে একনেতা শেখ মুজিব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, ‘গাদ্দারকে তো গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁকে কি এখনো হত্যা করা হয়নি?’ এ কথা শুনেমুফতী মাহমুদ সাহেব অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে বললেন, ‘কাকে গাদ্দার বলছো? মুজিব গাদ্দার নয়, তিনি একজন সুন্নী মুসলমান। প্রত্যেক মুসলমানের জানমালের হেফাজত করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।

মুফতি মাহমুদ ১৩ মার্চ তাঁর এক বক্তব্যে স্পষ্ট ভাষায় ইয়াহইয়া-ভুট্টোর নীতিকে ভুল আখ্যা দিয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহক্ষান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে শেখ মুজিবকে সরকার গঠনের জন্য আহক্ষান জানানো প্রেসিডেন্টের অবশ্যই কর্তব্য।
অন্যান্য :
বিভিন্ন তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, এদেশের আলেম সমাজ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে এমনকি এ দেশের স্বাধীনচেতা মানুষকে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করণে অনেক কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে মাওলানা আব্দুল মতিন চৌধুরী শায়খে ফুলবাড়ি (রহ.) সিলেট, মাওলানা হাবিব উল্লাহ(রহ.) সিলেট,মাওলানা লুৎফুর রহমান (রহ.) শায়খে বর্ণভী, সিলেট, শায়খুল হাদীস মাওলানা কাজী মু‘তাসিম বিল্লাহ (রহ.), শায়খুল হাদীস মরহুম তজম্মুল আলী (রহ.) সিলেট, মাওলানা আবুল হাসান (রহ.) যশোহর, মাওলানা আরিফ রাবক্ষানী (রহ.)ময়মনসিংহ, মুফতী মোঃ নুরুল্লাহ(রহ.) ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমী (রহ.) ঢাকা, মাওলানা মোস্তফা আজাদ, ঢাকা, প্রমুখ আলেমের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

পরিশেষে বলা যায়,একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলার বিভিন্ন মত ও পেশার লোকেরা অংশ নিয়েছিলেন। বাংলার আলেম সমাজও এর থেকে দূরে ছিলেন না। তাঁরা একমাত্র দেশপ্রেম ও দেশমাতৃকার টানে এবং নির্যাতিত জনগণ ওমা-বোনদের পাকিস্তানী হানাদারদের লালসার হাত থেকে রক্ষার জন্যেই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

তথ্য সূত্র ঃ
১. ইমাম হাফিজ মুহাম্মদ বিন ঈসা সারওয়াহ, সহীহ আত-তিরমিযী ২য় খ-।
২. ইমাম আবু দাউদ সুলায়মান ইবনুল আশ আস-সিজিস্তানী, সুনান আবু দাউদ২য় খ-। অনু. ড.আ.ফ,ম আবু বকর সিদ্দীক, ভলিউম-০৩, ইফাবা।
৩. ক. কে. রইছউদ্দিন, বাংলাদেশের ইতিহাস পরিক্রমা।
৪. শাহ আব্দুল আজিজ ফতওয়ায়ে অজীজী ।
৫. জুলফিকার আহমদ কিসমতি,আযাদী আন্দোলনে আলেম সমাজের ভুমিকা।
৬. দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিস্মৃত ইতিহাস।
৭. আবদুল মওদুদ, ওহাবী আন্দোলন।
৮. ডক্টর মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ, রাজনীতিতে বঙ্গীয় উলামার ভূমিকা।
৯. রাজনীতিতে বঙ্গীয় উলামার ভূমিকা।
১০. মোহাম্মদ মাকছুদ উল্লাহ,খতিব, স্বাাধীনতা সংগ্রামে আলেম সমাজ।
১১. অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আন্ওয়ার উল্লাহ, মাওলানা শামছুল হুদা পাঁচবাগী।
১২. স্বাারক মাওলানা অলিউর রহমার: জীবন ও সাহিত্য।
১৩. ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, মুফতী আমিমুল এহসান : জীবন ও কম।
১৪. সৈয়দ মবনু, দ্রাবিড় বাংলার রাজনীতি।
১৫. সাংবাদিকের কলাম থেকে, এহসান বিন মুজাহির।
১৬. শাকের হোসাইন শিবলি, একাত্তরের চেপে রাখা ইতিহাস, আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে।
১৭. মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস।
১৮. একাত্তরের চেঁপে রাখা ইতিহাস আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে।
১৯. এম আর আখতার মুকুল, আমি বিজয় দেখেছি।
২০. মাওলানা মুহাম্মদ তাহের, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জমিয়তে উলামা হিন্দের ভূমিকা ।
২১. আশফাক হাশেমী, কাইদে জমিয়ত মুফতী মাহমুদ, আশফাক হাশেমী, সাপ্তাহিক কওমী ডাইজেস্ট। (সমাপ্ত)।

 

লেখক: অধ্যক্ষ, সৈয়দপুর ফাজিল মাদ্রাসা, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ