jagannathpurpotrika-latest news

আজ, , ১৭ই জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

সংবাদ শিরোনাম :
«» বিশ্বনাথে জুয়ার আস্তানায় পুলিশের অভিযান, আটক ১ «» হবিগঞ্জে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, অর্থ লুট «» সিলেটে ইয়াবার চালানসহ অাটক ৩ «» বিশ্বনাথে সাজাপ্রাপ্ত আসামী গ্রেপ্তার «» দেশবাসী শুনে রাখেন মিন্নির কিছু হলে আমি আত্মহত্যা করমু «» সুনামগঞ্জে আইনজীবীর বাসায় দুর্ধর্ষ চুরি «» আল্লামা শায়খ যিয়া উদ্দিনের বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম নিয়ে লিখিত জীবনী স্মারকের মোড়ক উন্মোচন ৮ আগস্ট «» রাজনৈতিক সংকট এখন রাজনৈতিক শূন্যতায় পরিনত হয়েছে- মাওলানা ইসহাক «» বিশ্বনাথে এইচএসসিতে দুই বোনের জিপিএ-৫ লাভ «» দক্ষিণ সুনামগঞ্জে শতাধিক পরিবারে আল হান্নান ইসলামী সমাজ কল্যাণ সংস্থার ত্রাণ বিতরন




শবে বরাত ও আমাদের করণীয় : মুফতি সৈয়দ শামীম আহমদ

শাবান মাসে শবে বরাত নামক একটি পবিত্র রাত রয়েছে। শবে বরাত ফার্সি যৌগিক শব্দ। শব অর্থ রজনী বা রাত্রী বরাত অর্থ হিস্যা, ফরমান, নির্দেশ ও মুক্তি অর্থাৎ হিস্যা, ফরমান, নির্দেশ ও মুক্তির রজনী। মুসলিম উম্মাহর আকিদা হল এ রাত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনের হিসাব ও রিজিক বন্টন করা হয় ( ফয়রোজ ৯২ পৃঃ )
শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে শবে বরাত বলা হয়। যাকে আরবীতে লাইলাতুল বারাকাত বা নিসফে শাবান বলা হয়। তবে কেউ কেউ মনে করেন এ রাত্রের ফজিলত কোরআন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। এ রাতে জাগ্রত থাকা এবং বিশেষ ভাবে এ রাতের ইবাদত কে সওয়াবের কারণ মনে করার কোন ভিত্তি নেই , বরং এগুলো বিদাত। আর বিদাত হল যে জিনিষ কোরআন অথবা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়, সাহাবায়ে কেরাম থেকেও প্রমাণিত নয় এবং বুজুর্গানে দ্বীনের আমল দ্বারাও প্রমাণিত নয় সেটাকে দ্বীনের অঙ্গ মনে করা বিদাত। আর নিজের পক্ষ থেকে একটা পথ অবলম্বন করে নেয়ার নাম দ্বীন নয় বরং মানার নাম হলো দ্বীন। মানতে হবে কাকে? মানতে হবে হুজুর (সা.) কে, সাহাবায়ে কেরাম কে, তাবেঈন কে, এবং বুযুর্গানে দ্বীন কে। বাস্থবেই যদি এ রাতের ফজিলত প্রমাণিত না হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে রাতটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া বিদাত হবে। যেমনি ভাবে শবে মেরাজের ইবাদত কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। কিন্তু বাস্তব কথা হল শবে বরাতের ফজিলত কোরান-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয় একথা বলা যাবে না।

 

কোরআন সুন্নাহ দ্বারা শবে বরাত: সূরা দোখানের ৩নং আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন ‘‘আমি একে নাযিল করেছি এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী’’ মুফাস্সির ইকরিমাহ প্রমুখ কয়েকজন তাফসীরবিদ থেকে বর্ণিত আছে এ আয়াতে বরকতের রাত্রি বলে শবে বরাত কে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ তাফসীরবিদের মতে এখানে শবে কদর বোঝানো হয়েছে, যা রমজানের শেষ দশকে হয়। শবে বরাতের রেওয়ায়েতকে আল্লামা ইবনে কাসীর (র.) অগ্রাহ্য বলে সাব্যস্থ করেছেন। তবে কোন কোন মাশায়েখ শবে বরাতের রেওয়ায়েত দুর্বল হলেও কবুল করেছেন। কেননা ফজিলত সম্পর্কিত দুর্বল রেওয়ায়েত কবুল করার অবকাশ রয়েছে। মারিফুল কোরআন ৭/৭৪৮-৭৮৯
আল্লামা তাকি উছমানী দা.বা. বলেন। অন্তত দশজন সাহাবা এ রাতের ফজীলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে দু-একটি হাদীস সনদের বিবেচনায় অবশ্যই দুর্বল, যার কারনে কিছু উলামায়ে কেরাম এ রাতের ফজিলতকে ভিত্তিহীন বলেছেন। কিন্তু মুহাদ্দিস ও ফকিহগণ হাদীস শাস্ত্রের মূলণীতি সর্ম্পকে বলেন; সনদের বিবেচনায় কোন হাদীস যদি কমজোর হয়, যার সমর্থনে আরো হাদীস পাওয়া যায়, তাহলে সেই হাদীস আর দুর্বল থাকে না। আর দশজন সাহাবা শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে হাদীস বর্ণনা করেছেন। সুতরাং যার সমর্থনে দশজন সাহাবার হাদীস রয়েছে, সে বিষয়টি আর ভিত্তিহীন থাকে না। তাকে ভিত্তিহীন বলা ভুল হবে। ইলাহী খুতুবাত ৪/১৯২

খায়রুল কুরুন অর্থাৎ তিনটি যুগ মুসলিম উম্মাহর নিকট শ্রেষ্ট যুগ। সাহাবায়ে কেরামের যুগ। তাবেঈর যুগ। তবে-তাবেঈর যুগ। এ তিন যুগে দেখা গেছে শবে বরাত ফজিলতের রাত হিসাবে পালন করা হত। মানুষ এ রাতে ইবাদতের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দিত। সুতারাং এ রাত ফজিলতময়, এটাই সঠিক কথা। এ রাতে ইবাদতের জন্য জাগ্রত থাকলে এবং ইবাদত করলে অবশ্যই সওয়াব পাওয়া যাবে, এ রাতের অবশ্যই বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ইসলাহী খুতুবাত ৪/১৯২
হযতর আয়েশা (রা.) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ সেজদা করলেন যে, আমার ধারণা হল তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন; আমি তখন উঠে তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম, তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়লো; তিনি সেজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করে আমাকে লক্ষ করে বললেন, হে আয়িশা! তোমার কি এ আশংকা হয়েছে? আমি উত্তরে বল্লাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! আপনার দীর্ঘ সেজদা থেকে আমার আশংকা হয়েছিল আপনি মৃত্যু বরণ করেছেন কিনা? নবীজি (সা.) বললেন, তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলই ভালো জানেন। তখন নবীজি (সা.) বললেন এটা হল অর্ধ শাবানের রাত; এ রাতে আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন; ক্ষমা প্রার্থনা কারীদের ক্ষমা করে দেন; অনুগ্রহ প্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণ কারীদের তাদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন। শুআবুল ইমান,৩/৩৮২
হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) এ রাতে মদিনার কবরস্থান ‘জান্নাতুল বাকি’তে এসে মৃতদের জন্য দোয়া ইস্তিগফার করতেন। তিনি আরো বলেন, নবীজিতাকে বলেছেন, এ রাতে বনি কালবের ভেড়া বকরির পশমের (সংখ্যার পরিমাণের) চেয়েও বেশী সংখ্যক গুনাহগারকে আল্লাহ ক্ষমা করনে। তিরমিজি শরীফ হাদীস নং ৭৩৯
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যখন শাবানের মধ্য দিবস আসবে, তখন তোমরা রাতে নফল ইবাদত করবে ও দিনে রোজা পালন বরবে। (ইবনে মাজাহ) শবে বরাতের ফজিলত সংক্রান্ত আর অনেক হাদিস আছে যা এই ছোট্র পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব নয়। সুতারাং উপরোল্লেখিত আলোচনা থেকে শবে বরাত ফজিলতময় সাব্যস্থ হতে আর কোন বাধা থাকলোনা

 

করণীয়ও বর্জনীয়: শবে বরাত নিয়ে বেশী বাড়াবাড়ি করা সমচিন নয় বরং এ রাতের ফজিলত যে ভাবে বর্ণিত হয়েছে, সে ভাবে আমল করা উচিত। নিজ থেকে কোন কিছু বাড়িয়ে না করা, তাহলে লাভ থেকে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশী হয়ে যাবে। এ রাতে ইবাদতে বিশেষ কোন তরিকা নেই, অনেকে মনে করে থাকে এরাতে বিশেষ পদ্ধতিতে নামাজ পড়তে হয়। যেমন প্রথম রাকাতে অমুক সূরা দ্বিতীয় রাকাতে অমুক সূরা। এক রাকাতে অমুক সূরা এত বার অন্য রাকাতে এত বার, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং মনগরা, তা থেকে জনসাধারণকে অবশ্যই দূরে থাকা চাই। তেমনী এ রাতের করনীয় বিষয় গুলোর মধ্যে একটি হল কবর জিয়ারত। এ রাতে কবর জিয়ারত একাকী করাকেই ফুকাহায়ে কেরামগন সুন্নত বলেছেন। দল বেঁধে কবর জিয়ারত করা এবং কবর জিয়ারতের জন্য উলামাদেরকে টাকা পয়সা দিয়ে নিয়ে যাওয়া ও দোয়া করানো সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম। তবে আপনি একাই কবর জিয়ারতে গেছেন, অন্য জনও এভাবে একাই গেছেন, যেতে যেতে এক জামাত হয়ে গেল, তাহলে এই একত্রিত হওয়াটা শরীয়ত পরিপন্থি নয়।
এ রাতে বেশী বেশী উমরি কাযার নামাজ গুলো পড়া ভালো, কেননা কাল কিয়ামতের সময় উক্ত নামাযের জন্য আপনি জিজ্ঞাসিত হবেন, নফলের জন্য আপনি জিজ্ঞাসিত হবেন না। আর বর্তমান যুগে আমাদের অধিকাংশ মানুষের জীবনের অনেক নামাজই কাযা রয়েছে। তাই এ কাযা নামাজ গুলোকে খোঁজে খোঁজে আদায় করার চেষ্টা করা। আর যাদের কাযা নামাজ নেই তারা বেশী বেশী নফল নামাজ, বিশেষ করে সালাতুস তাসবিহের নামাজ এ রাতে পড়ার চেষ্টা করা।
আতশ বাজি, পটকা ফোটানো, বেহুদা ঘোরাফেরা, আনন্দ উল্লাস ও হালোদা-রুটির কারণে সময় নষ্ট করা ও মসজিদ ময়লা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই আসুন! আমরা প্রত্যেক ইবাদতকে শরীয়ত মোতাবেক আমল করি। শরীয়ত পরিপন্থি হয় এমন সব আমল থেকে বিরত থাকি। আমিন।

লেখক: মুফতি, জামেয়া দারুল হাদীস সৈয়দপুর, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।
মোবাইল: ০১৭৬৮৩৩০৭১

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ