jagannathpurpotrika-latest news

আজ, , ২০শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী

সংবাদ শিরোনাম :
«» সিলেটে ফুলের হাসি পাঠক ফোরামের কমিটি গঠন «» আমার বাসায় সমস্ত রান্না হয়েছে পেঁয়াজ ছাড়া : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা «» ছাতকে দুই পক্ষের সংঘর্ষে মহিলাসহ আহত ৫০ «» দোয়ারাবাজারে গভীর রাতে গরুর ঘরে আগুন «» ছাতকে অপ্রয়োজনীয় গতিরোধক উচ্ছেদ করলেন ইউএনও «» বিশ্বনাথে এক প্রবাসীর বিরুদ্ধে আরেক প্রবাসীর বসতঘর ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ «» বিশ্বনাথে ১৩ লাখ টাকা আত্বসাতের অভিযোগে মামলা, নারী আসামি গ্রেফতার «» ছাতকে ইয়াকুব হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবীতে এলাকাবাসির শোক সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত  «» জাতিসংঘে ১৪০দেশের ভোটে পাস হল রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন প্রস্তাব «» পিঁয়াজের প্রভাবে গরীবরা পড়েছে অভাবে : অাব্দুল তাহিদ




জন্ম বার্ষিক পালিত হয়েছে বাউলদের উজ্জ্বল নক্ষত্র ফকির দুর্বিন শাহ’র

।। আনোয়ার হোসেন রনি ।।
অন্তরায় আমার কলিজায়, প্রেম সেল বিধিল, বুক ছেদে পিঠপার হইল গো মারিয়া ভূজঙ্গঁ তীর কলিজা করিল চৌচির, কেমনে শিকারী তীর মারিল গো, বিষ মাখিয়া তীরের মুখে, মারিল তীর আমার বুকে, দেহ তইয়া প্রানটি লইয়া গেল গো, তার একটি জনপ্রিয় গান দেশ-বিদেশে সাধারন মানুষের কাছে পেয়েছেন রতœগর্ভা অমরত্ব একটি জনপ্রিয় গান । এ গানের রচিয়তা এই গানের বিরহী শ্রোতাদের অন্তরে চিরস্থায়ী বিরহ দহনের সৃষ্ঠি হয়েছে। এ রকম অসংখ্য বেদনার আকুলতি আর্তি করেছে মরমী কবি ফকির দৃর্বিন শাহ। মরমী কবি তার বন্ধুকে নিজের কাছে পেলেই কেবল প্রেমসেল ” দ্বারা বিদ্ধ হওয়া কিংবা অসহনীয় বিরহ জ¦ালা যন্ত্রনার আশংকা থাকে না। যুগ যুগ ধরে  এ কালে ”অবলা ”নারীরা পুরুষের প্রেমের ফাঁন্দে পড়ে ধুকে ধুকে মরছে। বন্ধুর বাঁশি সুরে পাগল হয়ে নারীর অন্তর, এই কেদেঁই চলছে এই ভাবনায়।।
 গীতিকার দুর্ব্বিন শাহ মঞ্চ কিংবা আসরে দর্শক  শ্রোতাদের মনোরঞ্জনের জন্য এসব গান রচনা করেছে এবং শিষ্য ভাব শিষ্যদের নিয়ে দলবলসহ গিয়েছিলেন। এসব গান বিচ্ছেদ শ্রোতাদের কাছে নান্দনিক আবেদন সৃষ্টি করে। ফকির দুর্ব্বিন শাহ মানুষের মনের আবেগ ভালভাবে উপলব্দি করতে পারতেন। যেটা সম্ভব হয়েছেন বলেই মানুষের প্রেম, বিরহ, দহন, ভালোবাসা নতুন মাত্রা পেযেছেন তার গানের মাঝেই।
ফকির দুর্ব্বিন শাহ বাউলদের মধ্যে উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাংলার লোক সাহিত্যে সুফি সাধক হিসেবে বাংলার ভাবুক জগতের সম্মানীত স্থান দখল করে রেখেছে। তিনি বহু প্রতিভার অধিকারী ছিলেন সমগ্র বিশ্ব বা ভু-মন্ডলের মধ্য স্থলে অর্ধ চন্দ্র বুঝাচ্ছেন নুরে মোহাম্মদী (সাঃ) বা ইসলাম ধর্মেও মহানত্ব, চারটি তরিকা ফকির, যে স্বীয় সৃষ্টির মাঝে বিভিন্ন স্তরে চারের সংযোগ বা সমারোহ দিয়ে পূর্ণতা আনয়ন করেছে। সৃষ্ঠির সুচনায় আরশ, কুরছি, লৌহ ও কলম, চারজন ফেরেস্তা আমাদের মধ্যে রয়েছে। মাটি, বাতাস, আগুন ও পানি এ চার উপাদানের সমাহার দিয়ে আদম বা মানুষ সৃষ্টি করেন। প্রত্যেক মানুষের জীবনে শৈশব কৈশোর যৌবন ও বাধক্য এ চার অবস্থা সংযোগ আয়ুস্কালের সমাপ্তি ঘটে। মানুষের আধ্যাত্বিক জীবন শরীয়ত, ত্বরীকত, হকিহত ও মারেফত এ চার স্তরের সমাহার পরিলক্ষিত হয়েছেন মরমী কবি ফকির দুব্বির্ন শাহর জীবনে। এ চার পয়গাম্ববের উপর আসমানী কিতার ও নাযেল করে। চার খলিফার সৃষ্টি রহস্যেও পূনঃস্বীকৃতি ও নিদর্শন এ চারের মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছেন ফকিরি ধারায়। চকি দরবার দিলা যারে, আগে ”এলাহি আলামিন” এবং হযরত শাহজালাল (রহঃ) কি সুন্দর এক নুরের বাতি হইয়াছে প্রচার বঙদেশের পুর্বাংশে শাহজালাল নামটি যার। ফকির ওলি দরবেশ ভাবুকরা বহু গানে পবিত্র কোরআন হাদিসের মর্মবাণী ও ইসলামের আধ্যাত্ববাদের আশ্চর্ষ্য সুন্দর প্রতিফলন বিরাজমান ছিল। ফকিরি ত্বরিকা প্রচারে বাংলার প্রত্যন্ত অঞলের সাথে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখে এদেশের দারিদ্র পীড়িত দুর্ভল কৃষক শিক্ষিত অশিক্ষিত সবার মাঝে বিচরণ করে অনেক বাধা বিঘœ পেড়িয়ে ও এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভাবে জগতের অমিয়বানী মানুষের কাছে পৌছে দেন। জ্ঞানপূর্ণ উপদেশবাণী এবং আল্লাহ ও নবীর শানে সুচারু রুপে প্রচারেই তার একমাত্র পথ সহায়ক ছিলেন তিনি। যুগে যুগে শিক্ষার গুরুত্ব কেহ অস্বীকার করতে পারবে না। ধর্ম সংস্কার শিক্ষাক্রম ঐতিহ্যবাহী আধুনিক নব্য ইতিহাস অসংখ্য বাস্তব দৃষ্টান্তের পরীক্ষণ ও সমস্যা সমাধানের সহায়ক। তিনি আমাদের সমাজে জনগনের ভুল সংশোধন মানুষের মনে প্রতি মুহুতে বুঝ তত্ব খুজে বের করার প্রচেষ্টার ফলে এগিয়ে যায় সমাজ আর উন্নত হয়েছে জাতি। ওলি দরবেশ পীর একজন গুরু পীর বা ফকিরই জ্ঞানহীন আলোর ভুমিকা রাখে। তার গানের মাধ্যমেই মানুষ ধর্মেও পুজারি বটে। কিন্তু সঠিক ধর্মীয় প্রশিক্ষণের পথ সহায়ক অনুসরণ না করলে ইহকালে ও পরকালের শান্তি লাভ করা যায় না। তিনি আধ্যাত্বিক জ্ঞানের পুর্ণতা নিয়ে নিঃস্বার্থভাবে ভাব ধারায় প্রচারের কাজে জীবনের প্রথম ধাপ হতে অদ্যাবধি খোদাকে স্মরণ করে মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়ে গেছেন ভাব জগতের মাধ্যমেই। সত্যিকার পথ প্রদর্শক তিনি হলেন নির্লোভ কোন স্বার্থ লাভের অনুপ্রেরণা তার মধ্যে কখনো ছিল না। তিনি সিলেটের বাউল ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে রয়েছে স্বকীয়তা। লোকগীতি, লোক সাহিত্য, পল্লীগীতি, ভাটিয়ালি, হামদ, নাত, গজল, মুর্শেদী, প্রেম বিরহ, দেহত্ব, মারফতি গান অসংখ্য বিচ্ছেদ গানের রচয়িতা । তার বড় প্রমাণ হচ্ছে সাহিত্যে কাজ ভান্ডার।
বৃহত্তর সিলেটের বাউল ফকির দুর্ব্বিন শাহ নাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবুজ ঘেরা দুর্ব্বিন টিলা জুড়ে গড়ে উঠেছে লোকারণ্য। কমলা লেবুর মৌ মৌ সৌরভে মেতে উঠে দুর্ব্বিন টিলার আশা পাশা এলাকায়। সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার শিল্প নগর ছাতক ঐতিহাসিক এশিয়ার উন্নতমানে সিমেন্ট কোম্পনীর উত্তর পাশে রয়েছে ”জ্ঞানের সাগর”ফকির।
তার জন্ম হচ্ছে ১৩২৭ বাংলা ১৫ই কার্তিক ২ নভেম্বর ১৯১০ সালে। তার  মৃত্যু হয়েছে ১৩৮৩ বাংলা ৩ ফাল্গুন ১ ফেব্রæয়ারী ১৯৭৭ সালে। তিনি জীবন পরিক্রমা ৫৭ বছর অতিক্রম করিলে ও রচনায় রয়েছে কালোত্তীর্ন। মরমী কবি জন্ম ও মৃত্যুও সন-সাল নিয়ে বাংলা ইংরেজী তারিখের মধ্যে মতপ্রাথক্য দেখা দিয়েছে বিভিন্ন গবেষকদের মাঝে মরমী কবি দুর্ব্বিন শাহকে নিয়ে। মরমী কবি দুর্ব্বিন শাহকে যারা দেখেছেন তার কন্ঠের গান ও শুনেছেন এমন লোক আজো আমাদের মাঝে রয়েছে। তিনি উনিশ শতকের কবি।
মরমী কবি দুর্ব্বিন শাহকে নিয়ে যারা বিভিন্ন সময় বই ম্যাগাজিন, পত্রিকায় প্রতিবেদন লিখেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য কয়েকজন আলোচিত ব্যক্তিদের লেখার আলোকপাত করতে বাধ্য হলাম। তারা কারা? তারা হলেন মরমী কবি দুর্ব্বিন শাহ’র গবেষক মোঃ শওকতুল হাসান চৌধুরী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যােগে ২০০৩ সালে প্রকাশিত দুর্ব্বিন শাহ’র গীতিমালা বইয়ের ১৭নং পৃষ্টায় উল্লেখ্য করেছেন মরমী কবি দুর্ব্বিন শাহ’র জন্ম ১৩২৭ বাংলা ১৫ইং কার্তিক ১৯১০ ইংরেজী সালে। মৃত্যু ১৩৮৩ বাংলা ৩ ফাল্গুন ১ ফের্রুয়ারী ১৯৭৭ ইংরেজী সালে। তার জীবন পরিক্রমায় তিনি ৫৭ বছর জীবিত ছিলেন। তার রচনা কালোত্তীর্ণ। গবেষক দুর্ব্বিন শাহ, এর জন্ম ১৩২৭ বাংলা ১৫ইং কার্তিক এবং ১৩৮৩ সনে উল্লেখ করেছেন। এখানে বাংলা সন এর হিসাব করে দেখা যায় যে, মরমী কবি দুর্ব্বিন শাহ ৫৬ বছর বয়সে তিনি মৃত্যু বরণ করেছে। কিন্তু গবেষক ইংরেজী সালে উল্লেখ থাকে যে, তিনি ১৯১০ সালে জন্ম গ্রহণ করে এবং ১৯৭৭ সালে মৃত্যু বরন করেন। তার হিসেবে সাথে দুর্ব্বিন শাহ ৬৭ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেছে। গবেষক এর এতো সুন্দর রচনাটি বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও ইংরেজীর অনুবাদ করলে বাস্তবে ভুলটি ধরা পড়তো। তিনি সুক্ষভাবে চিন্তা সাধারণ একটি হিসাবের বিয়ষটি নিয়ে এতো গভীরে যায়নি গবেষক। জন্ম মৃত্যু সন নিয়ে মত প্রাথক্য দেখা যেত না। মোহাম্মদ আলী খান এর সম্পাদিত ”মরমী গানে সুনামগঞ্জ” এর ৬২ পৃষ্টায় উল্লেখ্য করেন মরমী কবি দুর্ব্বিন শাহ, জন্ম ১৯১০ সালে এবং মৃত্যু ১৯৭৭ সালে বলা হয়েছে। এ হিসাব মতো মরমী কবি দুর্ব্বিন শাহ বয়স দাড়ায় ৬৭ বছর। আবার মোহাম্মদ আলী খান সম্পাদিত” অন্তরে তুষের অনল” বইয়ের ১০২ পৃষ্টায় বলা হয়েছে দুবির্ন শাহ, এর জন্ম ১৫ কার্তিক ১৩২৬ বাংলা ১৯১০ ইংরেজী এবং মৃত্যু ১৩৮৪ বাংলা ১৫ ফের্রুয়ারী ১৯৭৭ সালে মারা গেছেন। এখানে ১৩২৬ বাংলা তার জন্ম হলে এবং মৃত্যু ১৩৮৪ বাংলায়। এই হিসাব মতে তার বয়স দাড়ায় ৫৮ বছর এবং ১৯১০ সালে জন্ম মৃত্যু ১৯৭৭ সালে হলে তার মৃত্যু ৬৭ বছর দাড়ায়। হাবিবুর রহমান এনার সম্পাদিত কবিতায় ছোট কাগজ খোয়াব ১৯৯৮ সালে ৩য় সংখ্যার ৪৩নং পৃষ্টায় এ.টি.এম আহমেদ কায়ছারের লেখার মধ্যে বলা হয়েছে যে, মরমী কবি দুর্ব্বিন শাহের জন্ম ১৩২৭ বাংলার ১৫ই কার্তিক এবং মৃত্যু ১৩৮৪ সনে। তার লেখায় মরমী কবি দুর্ব্বিন শাহ ও পুর্ব পুরুষরা ছিলেন ফকির কালা শাহ, সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সৈদেরগাঁও ইউনিয়নের বুড়াইরগাঁও গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় সর্বপ্রথম বসবাস স্থাপন করেন। এ বাড়ীটি আজো পযর্ন্ত গোটা এলাকার সর্বমহলের কাছে মোকাম বাড়ী হিসেবে পরিচিত।
ফকির কালা শাহে ছিলেন দুই পুত্র সন্তান। মামন লাকু ও মামন পাকু। দুই জনই সংসার করেছিলেন। মামন লাকুর বর্তমান বংশধর ছিলেন আলহাজ্ব নুর আলী, রেজন আলী, প্রয়াত গ্রাম্য বিচারক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালিক, আব্দুস সালাম, আব্দুল গফ্ফার, কাজী মাওলানা আব্দুস সামাদ, মখলিছ আলী, মকবুল আলী, আইয়ুব করম আলী ব্রীজ একাডেমী পরিচালক, সাবেক ছাত্রলীগের কেন্দ্রিয় কমিটির সহ সম্পাদক মাসুদ কামাল সুফি। মামন পাকু তার সাত ছেলে নিয়ে চলে যান একই গ্রামের উত্তর পাড়ায়। এখানে তার এক ছেলে আব্দুল্লাহকে রেখে ছয় ছেলে সাথে নিয়ে দোলার বাজার ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর প্রকাশিত মামনপুর গ্রামে গিয়ে বসবাস স্থাপন করে। মামন পাকুর ছেলে আব্দুল্লাহের বর্তমান বংশধর তৈয়বুর রহমান অবসর প্রাপ্ত ব্যাংকার। মামন পাকু স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন মামনপুর গ্রামে সেখানে রয়েছে শাহ মোহাম্মদ রহিম উল্লাহ ও পীর রওশন আলী শাহের মাজার অবস্থিত। এখানে রয়েছে নিরব নিজর্ন মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ। প্রতি বছর ধারাবাহিক ভাবে পুরানো স্মৃতি অব্যাহত পালিত হচ্ছে ১৫ই মাঘ বার্ষিক উরুশ মোবারক অনুষ্টিত হয়। মামনপাকুর এর বর্তমান বংশধরায় ছাতক উপজেলার তিনটি স্থানে বসবাস করছে। মামনপুর, বুড়াইরগাঁও ও নোয়ারাই এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। মামনপুর গ্রামে বসবাস করছেন সরকুর আলী, আলতাব আলী, সাজিদ আলী প্রমুখ।
পরিবারিক পরিচিতি প্রতিষ্ঠা বংশকৌলীন্য বা বিত্তবৈভর কিছুই ছিল না তার। প্রতিষ্ঠানিক লেখাপড়ায় সুযোগও তেমন মেলেনি বলতে গেলে তিনি   স্বশিক্ষিত একজন সহজ সরল সাদা মনের মানুষ ছিলেন। মরমী সাহিত্যের উত্তরাধীকারের জন্য পরিবারের কাছেই তিনি প্রথম ও প্রধান ধুননী। বাবা শফাত আলী ছিলেন মরমী সাধক ও ফকির আর মা হাসিনা বানুও ছিলেন সাধনা পথেই পথিক। তাই বলা যায় দুবির্বন শাহ এর রক্তে ছিল ফকিরি টান। ও একই অর্থে বাবা যাই ছিলেন তার সাধনা গুরু। পরে ১৯৫৬ সালে ফকির দুবির্বন শাহ আজমির শরিফে গিয়ে বিশিষ্ট আধ্যাত্বিক সুফি সাধন সৈয়দ আব্দুস সামাদ ব্যালজেরির কাছে চিশতিয়া তরিকায় দাখিল হন। তার গানে গুরুর নাম ঊল্লেখ নেই, উপযুক্ত বয়সে দুবির্বন শাহ বিয়ে করেছিলেন। তিনি ছেলের জনকও হন। কিন্তু সংসার তাকে বাধতে পারেনী সফরসাধনা ও সংঙ্গীতেই তিনি মগ্ন ছিলেন জীবন সর্পে দিয়েছিলেন। তার মরমী গানের সুরের ধারায় ¯œাত হয়েছে বাংলার বিভিন্ন জনপদ। প্রবাসি বাঙ্গালীদের আমন্ত্রনে দুবির্বন শাহ ১৯৬৮ সালে বলতে গিয়ে বিদেশে সংবধনা ও সম্মাননা লাভ করেন। তার চমৎকার মাজা গলায় মরমী গান শুনে ও অভিভূত হয়েছেন বাঙ্গালী শ্রোতারা। পুর্ন বিকশিত হবার আগেই তার জীবনাবসান ঘটে। তার শিষ্য ভক্তরা এবং সেই সঙ্গে তার একমাত্র জীবিত পুত্র আলম শাহ এই সাধক পদকতা শিল্পীর সাধনা ও সংগীতে জাগিয়ে রয়েছেন- তার নামের মহিমাকে ক্ষুন্ন হতে দেয়নি।
ইদানিক লক্ষ করেছি দুবির্বন শাহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গান গুলো অনেক শিষ্যরা  নিজের নামেই ব্যবহার করেছে। অনেক গান সংগ্রহকের অভাবে রচিত অধিকাংশ গান সংরক্ষণের অভাবে শিল্পী নিজেই হারিয়ে ফেলেছে। মরমী কবি দুর্ব্বিন শাহ, বাবা ছিলেন শফাত শাহ। তিনি ছিলেন উদাসীন মানুষ। শফাত শাহ’র মুর্শেদী ছিলেন গাছের ডাল দিয়ে ঘোড়া বানিয়ে ছাতক শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। তার মুর্শেদ ছিলো অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী কামিল ফকির ছিলেন। তিনি এসেছিলেন ভারত শহর থেকে বাংলাদেশে মাটিতে। অরিন জঙ্গলায় মধ্যস্থান থেকে তাকে উদ্ধার করেছিলেন কয়েক জন ব্যক্তিরা। তার হাতে ছিল বাঁশের একটি বাঁশি সেই বাঁশি ভাল মন্দ বুঝেই মানুষ ছাড়াই সুর অবিরত বাজতো। তার কারামত দেখিয়ে অবাক করতেন সাধারন মানুষকে। তার বাঁশির সুরের বনের পশু পাখি ও পানির মাছ পর্যন্ত তার সামনে এসে ভিড় করতো। তিনি ফকির রহিম বকস মাস্তান। শফাত শাহ তার মুর্শেদ আদেশে ছাতকে উচ্চ টিল্লায় বসতি স্থাপন করেছিলেন। তিনি একই উপজেলার দোলার বাজার ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর মামনপুর গ্রামে থেকে তিনি মুর্শিদের নির্দেশ পেয়েই দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে নোয়ারাই গ্রামে ছাতকে উচ্চ টিল্লায় গিয়ে বসবাস করতে থাকেন।
মরমী কবি দুর্ব্বিন শাহ বাবা একাই টিলা এলাকায় অবস্থান নেন। একাধারে যুগ যুগ ধরে সুফিবাদ সাধনা করে সুফি কবি তার সমস্ত জীবন উৎসর্গ করে ফকিরি ধারায়। শফাত শাহ রাতে স্বপ্নেযোগে তিনি দেখতে পেয়েছেন এক দরবেশ তাকে নির্দিষ্ট জায়গা দেখিয়ে নির্দেশ করেছেন যে তিনি এখানে অবস্থান করে আছেন। তার সাথে দেখা করতে আহবান জানিয়েছেন। শফাত শাহ ঘটনাক্রমে এই অলি দরবেশ এর সাথে সাক্ষাত হয়েছিল। এই অলির নাম রহিম বকস মাস্তান। তিনি সৈয়দ শাহনুর এর শিষ্য ছিলেন। তখন শফাত শাহ দীর্ঘদিন ছিলেন বিভিন্ন নদীর পশ্চিম পাড়ে ধ্যান সাধনায় ছিলেন। দীর্ঘদিন দরবেশ এর সেবা কররা পর বাইয়াত গ্রহণ করেছেন। বাইয়াত গ্রহণের গুরু পরামর্শে তিনি সুরমা নদীর দক্ষিণ পাড়ে অরিন বনজঙ্গলে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেখানে দীর্ঘদিন কেটে যায়। পরিপূর্ণভাবে ফকিরালী পীর এর উপদেশ পালন করে আবারো শফাত শাহ তার নিজ পিত্রালয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন। শফাত শাহ এর আপন চাচাতো ভাই রহিম উল্লাহ শাহও একজন সুফি সাধক ছিলেন। এই দুই পীর একই স্থানে বসবাস করলে ধ্যান মগ্ন সফল হবে না জেনেই শফাত শাহ সুরমা নদীর দক্ষিণ পাড়ে যাবার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। তিনি যাত্রার পথে বুড়াইরগাঁও গ্রামে বেশকিছু দিন অবস্থান করেছিলেন। তিনি এখানে থাকার পর আবারো গুরুর কাছে চলে যান। গুরু নিদের্শ পেয়েই ভূবনে দক্ষিণ দিকে উচ্চ পাহাড়ে অবস্থান নিতে নৌ-পথে চলে যান শফাত শাহ। শফাত শাহ নৌ-পথে গিয়ে ছাতক উপজেলার আলোচিত তারামনি টিলায় অরিন বন জঙ্গলে অবস্থান নেন। তারামনি টিলায় চারিদিকে বন জঙ্গলে ঘেরা ছিল। সেখানে দিনের বেলা কেউ বসবাস করতো না বাঘ ভাল্লুক আর জ্বিন ভুত এর ভয়েই। সেই জায়গা শফাত শাহ’র একটি বট বৃক্ষ নামেই বিশাল গাছ ছিল। এই গাছের নিচে একাধারে দীর্ঘ ধ্যান মগ্ন ছিলেন তিনি। তখনকাল সময়ে চুনাপাথর পুড়িয়ে চুন তৈরীর কারখানা গড়ে উঠেছিল। বন জঙ্গল কাটতে গিয়ে কয়েক জন ব্যক্তি তারামনি টিলার পাশে গিয়ে দেখতে পায় একজন মানুষ ধ্যান মগ্ন অবস্থায় রয়েছে। তারা সবাই ভয় পেয়েই যায়। মানুষের আভাস পেয়েই শফাত শাহ ধ্যান মগ্ন ভঙ্গে যান এবং তিনি তাদেরকে ইশারা মাধ্যমেই ডেকে কাছে আনেন। শফাত শাহকে সবাই বলেছেন এখানে বাঘ আছে আপনি আমাদের সাথে চলুন। তিনি তাদের কথামতো রাজি হন নি। পরে তারা তাদের বাড়ী থেকে ভাঙ্গা চুর ছাছ দিয়ে বট বৃক্ষের পাশে শফাত শাহকে একটি ঘর করে দেন।
হযরত শাহ জালাল (রঃ) ইয়ামনি আধ্যাত্বিক সাধনার রাজধানী বলে বিশ্বের মানচিত্রে পরিচিত। আধ্যাত্বিক সাধনার মাধ্যমেই বাউল গান সাধনা করেছে। কেউ বলে সুফি কবি, কেউ বাউল পল্লী কবি, কেউ বলে ভাবুক কবি, কেউ বলে ফকির, কেউ বলে জ্ঞানের কবি, এছাড়া ফকির মরমী কবি দুর্ব্বিন শাহ নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি বলেছেন প্রবন্ধ, ফিচার, সমালোচনা করে গেছেন শিখর সন্ধানী গবেষক  লেখকরা। তিনি চার ত্বরিকার আধ্যাত্বিক মরমী কবি ছিলেন। তার ভাব জগতের গানের ভাষা পুর্বসুরি বাউল সাধকের চেয়ে ব্যতিক্রম ছিল। কোরআন হাদিসের শরীয়ত-মারিফত নিয়ে ব্যাপক বিশ্লেষণের পাশাপাশি দেহের নানা পরিপাকযন্ত্র ও রচনায় উপজীব্য করে তিনি গানের মাঝে কাঠামো তৈরি করেছেন। তিনি গানের মধ্যে নানা রকমের সাংকেতিক ভাষা এবং বাউলদের গোপন তত্ত¡ , আধ্যাতœবাদ ও বস্তুবাদী চেতনারই প্রয়াস ঘটিয়েছেন। জাতিগত বিদ্ধেষ এবং ধর্মীয় হানাহানির বিপরীতে তার গান এক চেতনার উৎস। মানবতাবাদ তার গানের অন্যতম অবলম্বন। শরিয়ত, মারিফত, হকিকত, তরিকত বিধানকে অবজ্ঞা করে। সমাজপতিদের লাঞ্ছনাকে অগ্রাহ্য করে বৈষ্ণব, সুফি ও সহজিয়া বাউলের ধারায় সংমিশ্রণ এক অপূর্ব মানবতত্ব গড়ে উঠেছিল। জাত পাত আচার বিচারের শুকনো বালুচরে তাদের এই নবভাবের বন্যায় যে মানব ধর্মের পলিমাটি পড়েছিল তাতে আমাদের পল্লী প্রান্তর সবুজ প্রাণের ফসল ভরে উঠেছিল। সাধারন খেটে খাওয়া মানুষের এ নিরকর দার্শনিকদের কথা ভাবলেই মনে পড়ে মুসলমান আধ্যাত্বিক কবিদের কথা-শানাল ফকির, শেখ মদন, শরীয়তী শাহ প্রভৃতি নাম শিক্ষিত শহরে সমাজে আজ ও পরিচিত। তিনি কতো বড় জ্ঞাত অজ্ঞাত লোক কবি ছিলেন দেহের খাচার মধ্যে হীরামন পাখির সন্ধান দিয়ে মানবদেহেকে পবিত্রতম করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। বাউল বলে আমরা যা বুঝি তা বাংলায় সুফী আর বাউল সাধনা ধারায় সমন্বয়ে সৃষ্ঠি জীবন দর্শনে। এই বাউল ও সুফীরা যে মানুষের সন্ধান হয়েছিলেন তা আপাতত দৃষ্ঠিতে দৃঢ়তত্বের ব্যাপার হলে ও সামাজিক দৃষ্টিতে তা ছিল জাতি পাত ধর্মের উপরে মানবতা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
সিলেটের বাউল দর্শনের ফকির দুর্ব্বিন শাহর গুরুত্বপূর্ন নাম উচ্চারিত হয়েছেন। এসব অচেনা অজানার তত্বপূর্ন আধ্যাত্বিক চেতনার প্রতিফলন এবং বাস্তবাদী চেতনারই বিকাশ ঘটিয়েছে। এছাড়া ধর্মীয় হানাহানির বিপরীতে তার গান সমাজ সংস্কারবাদী চেতনার উৎস। মানবতাবাদ তার গানের অন্যতম অলংকার রয়েছে। এই গানের বিরহী শ্রোতাদের অন্তরে চিরস্থায়ী বিরহ দহনের সৃষ্ঠি হয়েছে। এ রকম অসংখ্য বেদনার আকুলতি আর্তি করেছে মরমী কবি ফকির দৃর্বিন শাহ। মরমী কবি তার বন্ধুকে নিজের কাছে পেলেই কেবল প্রেমসেল ” দ্বারা বিদ্ধ হওয়া কিংবা অসহনীয় বিরহ জ্বালা যন্ত্রনার আশংকা থাকে না। যুগ যুগ ধরে  এ কালে ”অবলা ”নারীরা পুরুষের প্রেমের ফাঁন্দে পড়ে ধুকে ধুকে মরছে। বন্ধুর বাঁশি সুরে পাগল হয়ে নারীর অন্তর, এই কেদেঁই চলছে এই ভাবনায়।
তার আরেকটি জনপ্রিয় গান:
নির্জন যমুনার কুলে বসিয়া কদম্ব তলে
বাজায় বাঁশি বন্ধু শ্যামরায়।
বাঁশিতে কি মধু ভরা আমারে করিল সারা
আমি নারী গৃহে থাকা দায়
কালার বাঁশি হলো বাম বলে শুধু রাধা নাম
কুল বধু কুলমান মজায়
বাঁশি সুরে অঙ্গ জ্বলে ঘরের জল বাইরে ফেলে
মনে লয় যাব যমুনায়।
বন্দুর প্রতি হৃদয়ের এতই টান, যে টানে চিত্ত সর্বদা ব্যাকুল। কীভাবে সর্বকালিনক বন্ধুকে নিজের কাছে রাখা যায়- সেই চিন্তায় অস্থিত  প্রেমিকাচিত্র। তাই বন্বু বিরহে আকুল প্রান চায়, বন্বু যদি হইত নদীর জল, পিপাসাতে পান করিয়া পোড়াপ্রান করতাম শীতল। তাই বন্দু বিরহে আকুল প্রান চায়।
”বন্ধু যদি হইত নদীর জল
পিঁপাসাতে পান করিয়া পোড়া প্রান করতাম শীতল”
এছাড়া বারো মাসিতে প্রেমিক বিহীন এক অবলা-অসহায় নারীর বেদনাতুর চিত্র ফুঠে উঠেছে। এই পীরিত প্রেমের পাশাপাশি বাউলদের গানের আরেকটা বড়ো ধরা আছে দেহতত্ব।
দেহতত্ব অনুসারে এ গানের মধ্যে দিয়ে বাউলদের যে বিশ্বাস প্রতিফলন হয় তা হলো দেহ পরম  ……….অবস্তান । পরমান্তার সঙ্গেঁ ………মিলনের জন্য যে বিশেষ সাধনা, শরীরের মাপ ও মন এসব আলোকিত রয়েছে গুরুজন, দেহতত্ব আর মন শিক্ষা এই তিনটি বাউর সম্প্রদায়ের প্রধান সাধনা করে। সাধনা শিক্ষা দিতে গিয়ে গুরু বলেছেন তুমি নিজেকে  জানো এবং অজানা কে সাধনা ও উদঘাটন করা। বিশ্বাসীরা সাধারণ নিজের ভেতরের সত্তার সন্ধানে ব্যাকুল থাকেন। এই সত্তা খুজঁতে গিয়ে আপন দেহের খবর জানতে হয়। শরীয়ত ব্যবহার করে মারফতি ………দুবির্বন শাহ বলেছেন নিজেকে নিজে না ছিনলে নামাজ হবে না নিজের চেনার মন্ত্র উল্লেখ্য করেছেন ।
মানুষ আছে ব্যাপিয়া, দুনিয়া জুড়িয়া
দেখ তাল্লাশিয়া কার আছে রে… হুশঁ
মানুষ চিনা নয়নে ধারা যাইয়া চরণে
না চিনে মরিও না কেউ হইয়া বেহুশ \
আন্তস্বজপেতে দেখিবে নিরালাতে
সর্বদায় মানতে হবে আক্রোশ
প্রক্ষজ্ঞানের ধারায় যাইয়া প্রেম তলায়
আনন্দমানে হও সিদু পুরুষ ।
গুরুর পদে উরু যদি পড়ে সে ভেদবিশিষ্ট। এই ভেদ বিশিষ্ট ধারনা গুরু ছাড়া কেউ দিতে পাবে না। গুরু প্রাপ্ত ছাড়া ভেদবিধি ভ্রক্ষভাবে অর্জন করেই আত্ম¡স্বরুপ উম্মেচন করা সম্ভব। গুরুর প্রতি বিশ্বাস ভালোবাসার প্রয়োজন। সেই বিশ্বাস থেকেই মানুষ রুপি এই সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় ভক্ত শিষ্য সার্বক্ষনিক ব্যাকুল থাকেন। দুর্ব্বিন শাহ গভীর আর্তি নিয়ে উচ্চারণ করেছেন।
জন্মে জন্মে অপরাধী তোমারই চরণে রে…
হায় রে… আমার নি আছে তোমারে মনে।
বন্ধুয়ারে মন প্রান যৌবন দিলাম চরণে তোমার
পদছায়া দিয়ে রাখো জেনে দুরাচার
আশাতে নিরাশ কইরো না আমি দীনহীনে রে…।।
সেই পরম যিনি একজন বাউলের আরধ্য লালন যাকে বলেন মনের মানুষ। তারই চরণ পেতে পাবার আশায় জন্ম জন্মে শিষ্যের আরাধনা চলতেই থাকে।
ভক্তের অধীনে হয়ে ফুলের কান্ডার হওয়ার জন্যই শিষ্যের বার বার নিবেদন সুচক আর্তি। দুর্ব্বিন শাহ অপরাপর বাউলের মত দেহতত্ব এবং সাধনা তত্বের গান রচনা করেছেন। সাধনার পথ চলতে হলে পঞ্চতাত্বের ভেদ জানতে হবে। দুবির্বন শাহ তার উত্তরসুরিদের আগেই গুর্শ করে দিয়েছেন-
পঞ্চতাত্বের ভেদ বুঝিয়া করো না মন সাধনা
দেহ আছে পঞ্চতত্বে তারে আগে পিনো না
 সেই চেনা সম্বব হলেই মনোবাঞ্জা পুরণ হবে। তাই দুবির্বন শাহ সাবধান বানী-
পাঁচ পাঁচা পচিশের তত্ব এই দেহতে আছে সত্য
জানায় করেছে আয়ত্ব, এই দেহে লয় হবে না
বাউল মতবাদ অনুসারীদের দেহের কামভাব ও শ্বাস প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ না করতে পারাটাই চরম ব্যর্থতা। এ ক্ষেত্রে হলে ওপারে যাওয়া সম্বব নয় তাই মায়ার সাগরে পরিভ্রমন করার ক্ষেত্রে সতর্কতার আশ্রয় নেয়ার আহবান করেন দুবির্বন শাহ। তার পূর্ব সুরিরাও তাকে সতর্কতার আহবান করেন। দুবির্বন শাহ যেমন বলেছেন না জানিয়া ভুল করিওনা ঐ মায়র সাগরে, কত মাঝির ভরা খাইল মারা পড়িয়া নদীর বক্করে ।
জীবন ব্যবস্থা মানবাধিকার সত্য ও ন্যায় পরায়ণ হতে মিথ্যাকে বর্জন হালাল-হারাম চিহ্নিত করে চলার আদের্শ আমাদের চিরাচরিত্র ভাবে রয়েছেন তিনি। দুবির্ন শাহ জগৎ জীবনের সৃষ্টি পালনকর্তা ”খোদা”কে বিন্দুরুপী পরমাত্মা বলে উল্লেখ করে। যিনি সৃজন পালন সংহারনের সর্বময় কর্তা। মরমী বাউল ফকিরেরা যে ’’ভান্ড-ব্রক্ষান্ড” তত্তে¡ বিশ^াসী, তারই সুরে সৃষ্টির কীতিকর্মাও উদ্দেশে দুর্বিনের কন্ঠে শোনা গেছেন।
নিখিল ব্রক্ষান্ডে প্রতি দেহভান্ড
খেলিছ অখন্ডে থাকিয়া একা।
কত শত নামে হয়েছ ব্যত্ত, লক্ষ কোটি সুরত নাহি অন্ত দুর হইতে হয় দুরান্ত
তোমায় তল্লাশ করে দেখা।
নিরাকারের রহস্য ঘুচিয়ে সৃষ্টির আদি প্রভু নিরজ্ঞনের কাছে আরজি পেশ করেন এ মরমী সাধক। তিনি শাস্ত্র ছেড়ে আকার ধরে দিও দেখা দাসে রে”। এ সুত্রে পাঠকের মনে পড়বে লোকসাধকদের অমৃত বাণী। যারে দেখিনি নয়নে, তারে ভজিব কেমনে। সৃষ্টির তত্তে¡ সাথে জড়িয়ে আছেন নিগৃঢ় রহস্য। সেই ভেদ ভেঙ্গে সাধক বলেছেন।
ছিলেন নিরাকার, প্রভু কর্তার আপনার এশকে হয়ে ফিদা আহাদ হইতে, আপন কুদরতে জাতি নুর করেছেন জুদা।
আরেকটি ভাব জগতে গানে খোলামেলা বলেছেন ফকির দুর্ব্বিন শাহ।
সেই নুর খোদায় করিয়া সৃজন
দশটা অংশ বানায় শেষে সাই নিরজ্ঞন
আরশ-কুরুশ-লও হে কলম চতুরাংশ তৈয়ার।
চন্দ্র-সুর্ষ বেহেস্তর-দোজখ হয়
আকাশ, পাতাল, হুর-পরী-ফেরেশতা যত রয়
বেদ-বেদান্ত মতে কয়, সকলেই নুরের সঞার।
সৃষ্টির উপকরণের মূলে যে রয়েছেন ”নুর” সেই বিষয়টিই গানে গানে প্রচারিত হয়েছেন। মুলতত্তে¡ও শাখা-প্রশাখা। দেহসাধনার আবার আছেন নানা পথ ও পন্থা রয়েছেন। মরমী সাধনায় মানব দেহকে কখনো ”ঘর” কখনো ”খাচা” কখনো ” জমি” কখনো” নৌকা” আবার কখনো ”জাহাজ” বলে উল্লেখ করা হয়েছেন। এই দেহের মধ্যেই লুকিয়ে আছেন ”মনের মানুষ” সহজ মানুষ” অধর মানুষ” বা সাই নিরজ্ঞন। দুব্বিন শাহ একটি গানে ”তরি” মানে দেহতরীর তুলনা এসেছেন। যেমনঃ
কী সুন্দর চালাইল তরি চালাইলে চলে, জলে কি স্থলে করেছে আজব কারিগরি।
তরি চৌদ্দ পোয়া লম্বা হয়, দুই ধারে পাখা বয়
আগুন-হাওয়া-মাটি-জল দিয়াছে ভরি
দেখতে কি সুন্দর, অতি মনোহর দ্বারে দ্বারে আছে প্রহরী।
তরি ভিতরে খোলা, মাঝখানে চোলা
দিতে হয় কয়লা বোঝাই করি
নয়টি জানালা, রইয়াছে খোলা,
ভিতরে তার আটটি কোঠরি।
ফকির দুর্ব্বিন শাহর গানে আবার ”দেহকে” জমি”র সাথে তুলনা করা হয়েছেন এই দেহ বাংলার জমিদারীর কথা বলেছেন।
”দেহজমি পতিত রইল আবাদ করলে না
খাস মহল খাজনা বাকি উসল কেন দিলে না ”
তার একটি গানের সাথে ভাবের মিল খোজে পাওয়া যায়। ”মন তুমি কৃষি জান না, এমন মানবজমিন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলতো সোনা” ফকির সাধক দুর্ব্বিন শাহ তার আরেকটি গানে আল্লাহ-নবির বন্দনায় সৃষ্টিতত্ত¡ ও সাধনা রহস্যেও কথা বর্ণিত করা হয়েছে। গভীর ভক্তি নিবেদনে ”আশেক”রুপী গানে গানে তার ”মাশুক”কে স্মরন করেছেন। নিরাকার ¯্রষ্টার সাকার-রহস্য সুফি সাধকেরা যে ভাবে আবিস্কার ও অনুভব করেছেন তার গানে আভাস মেলেছেন।
সাকার খোদা মক্কায় নাই তালাশ করে দেখো রে ভাই
আদমের ক্বলবে পাই কোরানের বিচারে
আদম আল্লার ভেদের কায়া বলছে বারে বারে
ছায়ারুপী কায়া হইল দুব্বিন শাহ কয় খেলা করে।
ফকির দুর্ব্বিন শাহর গানে নবী মহিমা কীর্তি হয়েছেন, কখনো সৃষ্টিতত্ত¡ কখনো সৃষ্টিকতার সাথে নিভৃঢ় সম্পর্কের সুত্রে-আবার কখনো মানব মুক্তির দিশারী কিংবা মরমী সাধনার প্রেরণা পুরুষ বলা হয়। তার ভাষায় নবী নুরের স্বত্ত¡, ইসলামতত্ত¡, ত্রি-ভূবন মত্ত ছিলেন। তার গানে প্রতীকী রুপ রাখানি সৌরভে সৃষ্টিকুল বর্ণনা শুনি।
কাবার পাশে রঙিন বেশে ফুটল গোলাপ ফুল
ত্রিভুবনের দ্রমর শুনে খুশবয়ে আকুল।
আরশের গাছেরই মুল, কাবাতে ফুটছে রে ফুল
সেই ফুলের খুশবয়ে হলো দুনিয়া মশগুল
মধুর আশে ঘুরে পাশে দ্রমরা বুলবুল।
লা-ইলাহার বাগানেতে ফুটেছে ইল্লাল্লার ফুল
গাছের নামটি আলিকলতা ফুলটা মোহাম্মদ রসুল।
সে প্রিয়তম নবীর জন্যে প্রাণ কাদে তার চরনের চাকর ব্যাকুল কন্ঠে ফুটে উঠে আকুতি।
আমায় নিয়া চলে তোরা ঐ না আরব দেশে
দিবানিশি যার কারনে কাদি একা বসে।
নাম শুনে প্রাণ হয় দেওয়ানা, আমায় নিয়ে যাও মদিনা মনপ্রাণ টিকিতে চায় না উড়িল বাতাসে।
জীবনে মরনে তার স্মরনে মুক্তির উপায় খুজেছেন এই মরমী সাধক। তারই সাধনায় চরন পরশে আধার ঘুচিল মরুদেশে-সাহারাতে আধারেতে উঠিল ইসলাম রবি, নুরে আলো গুলো সারে আলমের নবী”। নানা প্রকৃতির নবী বন্দনার গান আরো অনেক রয়েছেন। নুর নবীর কথা নানা ভাবে দুর্ব্বিন শাহর গানে এসেছেন, তেমনি তার পুর্ব সুরি নবী-রসুলদের কীর্তিকথা ও শ্রদ্ধার সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম চার খলিফার নাম বাদ যাননি। প্রেমতত্তে¡র কীর্তিমান নবীদের শানে গানে গানে বলেছেন। এছাড়া আল্লাহ নবী বন্দনার পাশাপশি পীর মুশের্দী, আউলিয়া দরবেশ-স্মরনের নিদশন ও পাওয়া গেছে দুব্বির্ন শাহের গানে। শ্রদ্বায়-ভত্তিতে স্মরিত হয়েছে। বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) মাহবুবে ছোবহানি, আব্দুল কাদের জিলানী-/আশিকে সুলতান বাবা কুতুবে রব্বানী। খাজা মইন উদ্দিন চিশতি (রহঃ)-গরিব নেওয়াজ নামটি দয়াল খাজা/ ছাতক প্রশাসনের উদ্দ্যোগে মরমী সাধক দুর্ব্বিন শাহের জন্ম বার্ষিক পালিত করা হচ্ছে।  উপজেলা পরিষদে সামনে মরমী সাধক নামে দুর্ব্বিন শাহ মঞ্চ তৈরি হলে ও সেখানে অনুষ্টান না করে অন্যস্থান করা হলো কেন? এ নেপথ্যে কারন কি?
লেখক: আনোয়ার হোসেন রনি, সাধারণ সম্পাদক: ছাতক প্রেসক্লাব, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: জাতীয় কাব্যকথা সাহিত্য পরিষদ সুনামগঞ্জ জেলা, ছাতক প্রতিনিধি দৈনিক যুগান্তর: মোবাইল
01711- 447686
এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ