jagannathpurpotrika-latest news

আজ, , ৯ই রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

সংবাদ শিরোনাম :
«» জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সিলেট মহানগরীর বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত «» বিশ্বনাথে ১০দিন আটক রেখে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ : ধর্ষক আটক «» বিশ্বনাথে দুই পক্ষের সংঘর্ষে  নারীসহ আহত ১০ «» দোয়ারায় শাহ আরেফিন বাজারের প্রবেশ পথ বন্ধ  করে টিনের ছাপরাঘর নির্মাণের অভিযোগ «» সাধারণ পাঠাগার সৈয়দপুরে নতুন কমিটি গঠনের লক্ষে অালোচনা সভা অনুষ্ঠিত «» শফিক চৌধুরী নেতৃত্বে নেই এমনটা সহজে মেনে নিতে পারছেন না অনেকে «» জগন্নাথপুরে ব্যবসায়ীর পচন ধরা রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার «» জগন্নাথপুর সরকারি কলেজে নবীনবরণ উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান «» সৈয়দপুর বাজারে চাদাবাজি! «» সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে চমক দিয়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ




ছাতক এক প্রাচীন জনপদ : আ‌নোয়ার হো‌সেন র‌নি

সুনামগঞ্জের ছাতক এক প্রাচীন জনপদ আ‌লো‌কিত বা‌নি‌জ্যিক জোন হি‌সে‌বে সুলতানী আমল থে‌কে আনুষ্টা‌নিক যাত্রা শুরু হয়ে‌ছিল। সুলতানী আমল থে‌কে ছাত‌কের বা‌নি‌জ্যিক যাত্রা শুরু হ‌য়ে‌ছিল ১৭৫৭ সালে মীর জাফর আলী খাঁ, রায়দুর্লভ ও জগতশেঠ গং দের চক্রান্তে বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ্দৌলা বঙ্গের নদীয়া জেলার আম বাগানে ইংরেজদের সাথে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরাজিত হন। সাথে সাথে বাংলার স্বাধীনতার সুর্য অস্তমিত হয়। সিরাজ উদ্দৌলার পতনের পর বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর বাঙ্গাল সুবাদার হিসেবে স্বীকৃত হয়। পরবর্তিকালে তার উপর ইংরেজরা অসন্তুষ্ট হয়ে মীর কাসেমকে স্থলবর্তি করে। উল্লেখ যে, বৃহত্তর সিলে‌টের ছাত‌কের সুলতানী আমল থেকে চুণা
ব্যবসায় প্রসিদ্ধ ছিল । মীর কাসেমের আমলে ইংরেজরা সিলে‌টের ছাত‌কে অনুপ্রবেশ করে এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চুণা ব্যবসা করার জন্য মীর কাসেম কে দিয়ে সন্ধি করে।

 

 

 

১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে ২৭ সেপ্টেম্বর মীর কাসেমের সাপক্ষে সিলেটের ছাত‌কে চুণা সরবরাহের সন্ধি করা হয়। কিন্তু ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন চুণা সরবরাহের অজুহাতে সিলেটের ছাত‌কে মানুষের উপর অমানবিক উৎপিড়ন চালাতে থাকে। মীর কাসেম ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকদের অত্যাচার নির্যাতন থেকে সিলেট সহ বাংলার মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান। ইংরেজরা মীর কাসেমকে তাদের বিপক্ষে দেখে মীর জাফরকে বাংলার মসনদে পুনস্থাপন করে ১৭৬৩ সালের ১০ ই জুলাই সিলেটের ছাত‌কে চুণা ব্যবসা ব্যপ্তি জন্য ৫ ম দফায় নতুন সন্ধি পত্র প্রণয়ন করে। এই সন্ধি পত্র মোতাবেক ইংরেজরা চুণার আয়করের অর্ধেক মালিক হইয়া পড়ে এবং অপরার্ধেক সরকারের ব্যবহারের জন্য রয়ে যায়। এ বাভেই মীর জাফরের
সহযোগিতায় একটি একটি করে দেশীয় রাজ্য ইংরেজদের দখলে আসে।

 

 

১৭৬৫ সালে ইংরেজরা বঙ্গ বিহার ও উড়িষার দেওয়ানী লাভ করায় সিলেটও তাদের দখল আসে। এ সময় (জয়ন্তীয়া ও লাউড় রাজ্য ব্যতিত) সিলেটের নবাবদের অধিকৃত ভূভাগের পরিমাণ ছিল ২৮৬১ বর্গমাইল।

 

 

ইংরেজ কোম্পানী ২৮৬১ বর্গমাইল ভূভাগের শুধু মাত্র রাজস্ব আদায়ে নিযুক্ত ছিল। শাসন ভার বা ফৌজদারী ক্ষমতা তখন নবাবগণের হাতেই ন্যস্ত ছিল [২] ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হিস্টিংস ভারতে ২৫০ টি মত জেলা সৃষ্টি করেন। তখন সিলেটকেও জেলায় রুপান্তর করা হয়। পূর্ব বঙ্গের রাজস্ব সংগ্রহ ইত্যাদি প্রয়োজনীয় কর্ম নির্বাহের জন্য ঢাকায় রেডিনিউ বোড প্রতিষ্ঠিত করা হয় । সেই বোড হতে মিষ্টার থেকার (Thecker) সর্বোচ্চ কর্মচারী রুপে সিলেটে প্রথম আগমন করেন । তখনকার সময়
ইংরেজ কর্মচারী দিগকে রেসিডেন্ট উপাদিতে আখ্যায়িত করা হতো। থেকারের সময় জয়ন্তীয়ার রাজা ছত্রসিংহ সিলেটের বৃটিশ প্রজাদিগকে নিপিড়িত করতেন। যে কারণ থেকারের আদেশানুসারে মেজর হেনিকার কর্তৃক পরিচালিত বৃটিশ সৈন্য জয়ন্তীয়া জয়ে সমর্থ হয়। এ ভাবে জয়ন্তীয়া কাছার ইত্যাদি রাজ্য সমুহ বৃটিশ শাসনের আওতায় সিলেটের কালেক্টরীর অন্তর্ভুক্ত হলে সিলেটের ভূভাগের আয়তন ৩৮০০ বর্গমাইলে গিয়ে দাঁড়ায়। [১][২]১৭৮০ সালে থেকার চলে গেলে
রবার্ট লিন্ডসে নামক এক ইংরেজ কাউন্সিলার সিলেটের কালেক্ট হয়ে আসেন। এখানে এসে নিন্ডসে সিলেটের সম্পদের প্রতি ধারণা লাভ হয়। তাই তিনি ব্যক্তিগত তবিল থেকে এখানে প্রচুর টাকা বি‌নিময় করে বিভিন্ন জাতীয় ব্যবসা যেমন, চুনাপাথর, লবন, হাতির চামরা, জাহাজ তৈরি ও বিক্রি ইত্যাদিতে আত্মনিয়োগ করেন। অফিসের সময়টুকু বাদ দিয়ে বাকি সময়টুকু ব্যবসায়
ব্যয় করে লিন্ডসে অগাধ অর্থ উপার্জন করেন। এ সময় সিলেটের লোক সংখ্যা ছিল ১ লাখ। আর রাজ্যস্য ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার। লিন্ডসে আত্মজীবনি গ্রন্থের বরাতে অচ্যুত চরণ চৌধুরী সহ অনেক ঐতিহাসিকগণ লিখেনঃ এ প্রদেশের দায়িত্ব
লাভ ও বেশি দিন থাকার জন্য লিন্ডসে ইংরেজ কোম্পানির উর্ধতম কর্ম-কর্তাদেরকে বহু উত্কুচ দিয়েছেন এবং এখানের রাজস্ব বিষয়ে কোম্পানির
কাছে তিনি তার নিজ তবিল থেকেও সময় মত রাজস্ব আদায় করে যোগ্যতা প্রমাণ করতেন। এভাবে তিনি প্রচুরটাকা উপার্জন করে লর্ড শ্রেণীতে উন্নিত হন। কিন্তু তিনি সিলেটবাসীর উন্নয়নের জন্যে সামান্যতম অবদান রাখেনি [১][২]। ১৭৮১ সালে সিলেটে প্রলয়ঙ্করী বন্যার পানি ৩০ ফুট উঁচু হয়েছিল বলে রবার্ট লিন্ডসে তার জীবনিতে উল্লেখ করেন। কিন্তু ইংরেজ কোম্পানি দুর্গত্য মানুষের রক্ষার্তে কোন উদ্যোগ নেয়নি। লিন্ডসেও তার দায়দায়িত্ব অবলিলায় এড়িয়ে যান। এ সময় দুর্ভিক্ষ ও মহামারিতে কোম্পানির অবহেলায় সিলেটের হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। যার ফলে ইংরেজ শাসনকে মানুষ সহজ ভাবে মেনে নিতে পারেনি। ভেতরে ভেতরে মানুষের মনে বিদ্রোহ পুঞ্জীভূত হতে
থাকে।

 

 

১৭৮৯ সালে লিণ্ডসে সিলেট থেকে চলে গেলে তার স্থানে জন উইলিস সিলেটের কালেক্ট নিযুক্ত হন। উইলিস সিলেট আসিয়া প্রায় লক্ষ টাকা ব্যয়ে সিলেটের জেল নির্মান করেন । ১৭৮৯ সালের জুলাই মাসে জন উইলিস সমগ্র সিলেটের লোক সংখ্যা গণনা করে। তাতে সিলেটের অধিবাসী সংখ্যা ৪৯২৯৪৫ এ দাড়ায়। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে কোম্পানির শাসন চলেছিল মূলত এবং মুখ্যত লাভজনক ব্যবসায়িক দৃষ্টি ও রীতিপদ্ধতিতেই। আর ইংরেজ আয়করের অর্ধেক মালিক হয়ে পড়ে এবং অপরার্ধেক সরকারের ব্যবহারের জন্য রয়ে যায়। দেশীয় অর্থনীতির স্বনির্ভর সত্তাকে পরনির্ভর করার কার্যক্রম শুরু হয়। বৃটিশ সরকার এক চার্টার অ্যাক্ট বলে কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যাধিকার বিলুপ্ত করে এবং দেশের শাসনভার কোম্পানির উপর ন্যস্ত করে। এতে নবাবগণ ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন । এই সুযোগে কোম্পানির লোকেরা খাজনা আদায়ের নামে অবাধ লুণ্ঠন ও অত্যাচার শুরু করে
দেয়।

 

 

রাজস্ব আদায়ের সুবিদা জন্য সিলেটে ১০ টি কেন্দ্র বা কালেক্টরী বিভাগ স্থাপিত করা হয়। এ কেন্দ্র গুলোর মধ্যে উত্তর শ্রীহট্টে ছিল; পারকুল, তাজপুর ও জয়ন্তীয়াপুর এই তিনটি। করিমগঞ্জে; লাতু এবং দহ্মিণ শ্রীহট্টে; নয়াখালি, রাজনগর ও হিঙ্গাজিয়া। হবিগঞ্জেঃ নবীগঞ্জ, লস্করপুর ও শঙ্করপাশা এবং সুনামগঞ্জের কালেক্টরী বিভাগ ছিল রসুলগঞ্জ। তখন সিলেটে নবাবি আমলের নির্দিষ্ট ১৬৪ পরগণা ছিল । ১৭৯৩ সালে উইলিস সিলেট ত্যাগ করেন। জন উইলিস’র পর ১৭৯৪ সালে রেইট ও জর্জ ইংলিস নামক দুই ব্যক্তি মিলিত হয়ে বর্তমান ছাতক শহরে রেইট ইংলিস এণ্ড কোম্পানী নামে যৌথ কারবার স্থাপন করে চুনা ব্যবসা শুরু করে। এই কোম্পানীর অভ্যুদয়ের পুর্বে ছাতক একটি সামান্য গ্রাম ছিল। তত্পুর্বে একজন সন্ন্যাসী ভূমীতে একটি ছাতি পোথিয়া তার ছায়ায় বসে তপ করতেন। সন্যাসীকে কেন্দ্র করে লোক আগমন ঘটলে, ক্রমে এই স্থান ক্ষুদ্র হাটে পরিণত হয়। কালক্রমে ছত্রক বা ছাতক বাজার আখ্যা হয়েছে [২] । এই ছাতক বাজারকে কেন্দ্র করে ইংলিস এণ্ড কোম্পানী পূর্ণ উদ্যমে চুনার ব্যবসা চালিয়ে যায়। কোম্পানী চুক্তির করে লোকদের দিয়ে চুনা সংগ্রহ করে কলিকাতায় চালান করত। ১৭৯৭ সালে জন অমুটি নামের কালেক্টর সিলেট আসেন। অমুটির সময় সিলেটে ইট দিয়ে তিন কোঠা বিশিষ্ট এক দালান তৈরি করেন। এ দালানে যতাক্রমে এক কোঠায় সরকারী কাজপত্র সংরক্ষন করা হত, অন্য কোঠায় কর্মচারীদের অফিস ও আরেকটিতে ছিল বিচারালয়। ১৭৯৮ সালের প্রারম্ভে বিভিন্ন প্র্যোজনিয় বস্তুর দাম বৃদ্ধি হলে উত্কৃষ্ট চালের মণ বার আনায় দাড়ায়। এমনি অবস্থায় ১৮০০ সালে সিলেট শহরে বসানো গৃহ কর। একদিকে দ্রাব্যাদির মুল্যবৃদ্ধি এর মধ্যে গৃহ কর বসানোর কারণ মানুষে কষ্ট বেড়ে যায়। ১৮০৩ সালে অমুটি বিদায় হলেন অস্থায়ী কালেক্টরদের আগমনের কারণ সিলেটবাসীর অভাব-অভিযোগের অগ্রগতি থেমে যায়। ১৮০৭ -১২ সালে অনেক নতুন আবাদি ভূমী বন্দোবস্ত দেয়া হয়। এ বন্দোবস্তই ‘তালুক’ হালাবাদি মুমাদি ইত্যাদি নামে অভহিত হয়। ১৮১১ সালে গৃহ কর নিয়ে নানা ভাবে উত্পিড়িত হন সিলেটের মানুষ। এসময় বর্তমান বন্দর বাজারের নিকট দুপুড়ি হাওয়রে উত্তর পশ্চিমে বিস্তৃত রাস্তার পাশের কিছু সংখক দোকান-পাট ছিল। গৃহ করের চাপের কারণ অনেক গুলো দোকান-পাট বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান বন্দর বাজার অনেকাংশেই জলাভুমীতে পরিণত ছিল। পরে এ স্থানে মাটি ফেলে ভরাট করা হলে পুর্বে উল্লেখিত দুপুরি হাওয়র হতে বর্তমান বাজার পর্যন্ত দোকান স্থাপন করা হয়। যা বর্তমানে বন্দর বাজারে পরিণত হয় [২]। ১৮২৪ সালে আসাম সম্পুর্ণ ভাবে ইংরেজদের দখলে আসে। এসময় জয়ন্তীয়ার মধ্যদিয়ে আসামে যাত্রা পথ ছিল । কিন্তু ব্রহ্ম যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ায় এটি বন্ধ হয়ে যায়। তখন আসামে যাতায়ত সুবিদার জন্য পাণ্ডুয়া চেরাপুঞ্জি
হয়ে শিলং পর্যন্ত নতুন রাস্তা প্রস্তুয় করা হয়।

 

লেখক: সাধারন সম্পাদক: ছাতক প্রেসক্লাব, মা‌সিক কাব্যকথা সা‌হিত্য প‌ত্রিকার সহ-সম্পাদক ও জাতীয় কাব্যকথা সা‌হিত্য প‌রিষদ সুনামগঞ্জ জেলার সভাপ‌তি- মোবাঃ 01711-447686

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ