jagannathpurpotrika-latest news

আজ, , ২৯শে শাবান, ১৪৪২ হিজরী

সংবাদ শিরোনাম :




গীবত : পরিপ্রেক্ষিত ইসলাম : ড. সৈয়দ রেজওয়ান আহমদ

আমাদের সমাজে অহরহ যে গুনাহটি পরিমানে বেশি করে থাকি, তা হচ্ছে ‘গীবত’। এটি এমন একটি গুনাহ যা করার সময় আমাদের মনে হয় না যে, আমরা গুনাহ করছি। কেননা আমরা জানি না গীবত কি? গীবতের শাব্দিক অর্থ হল পরনিন্দা বা সমালোচনা। মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন ‘হে মোমিনগণ! তোমরা একে অপরের পশ্চাতে পরনিন্দা করো না, তোমাদের কেউ কি স্বীয় মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সীমাহীন ক্ষমাকারী এবং দয়ালু।’ (আল কুরআন; ৪৯ : ১২)। এই আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা কারো গীবত করাকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। ‘গীবত’ সম্পর্কে- হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, একদা রাসুল সা. উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা কি বলতে পার, ‘গীবত’ কাকে বলে? সাহাবিগণ আরজ করলেন, আল্লাহ ও তার রাসুলই সা. ভাল জানেন। তখন রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করলেন, ‘গীবত’ হল কোন ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ ত্রুটি বর্ণনা করা, যা শুনলে সে অসন্তুষ্ট হয় এবং অন্তরে আঘাত পায়। অর্থ্যাৎ কারো অগোচরে তার এমন দোষ বলা যা বাস্তবেই তার মধ্যে আছে, তাই ‘গীবত’। (তিরমিজি শরীফ) হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত রাসুল সা. ইরশাদ করেন, ‘গীবত’ ব্যভিচারের চেয়েও জঘন্য গোনাহ। তিনি রা. রাসুলুল্লাহ সা. এর কাছে জানতে চাইলেন এটা কিরূপে? তিনি বললেন, এক ব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তাওবাহ করলে তার গোনাহ মাফ হয়ে যায়। কিন্তু যে ‘গীবত’ করে তার গোনাহ প্রতিপক্ষের মাফ না করা পর্যন্ত মাফ হয় না”। (তাফসিরে মাযহারী) ‘গীবত’র ক্ষতিসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো যার ‘গীবত’ করা হয় তার আমলনামায় গীবতকারীর সওয়াব চলে যায় এবং ‘গীবত’কারীর আমলনামায় যার ‘গীবত’ করা হয় তার গুনাহ চলে আসে। এ জন্যই হযরত হাসান বসরী রহ. যখন শুনতে পেতেন তার সম্পর্কে কেউ গীবত করেছে, তখন তিনি সেই ব্যক্তির জন্য অনেক ফল ও বিভিন্ন মিষ্টান্ন দ্রব্য হাদিয়া হিসেবে পাঠিয়ে দিতেন এবং বলতেন, মাশাআল্লাহ তিনি আমার অনেক উপকার করেছেন। গীবত হচ্ছে গোনাহে কবীরাহ বা বড় গুনাহ। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ পাক আরো বলেন, ‘দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে।’ (আল কুরআন; ১০৪ : ১) সুতরাং, গীবত কোনো অবস্থাতেই জায়েজ নেই। অন্যদিকে কারো দ্বারা গীবতের মত গর্হিত অপরাধ সংঘটিত হয়ে গেলে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। অর্থাৎ যার গীবত করা হয়েছে, সে ব্যক্তি জীবিত থাকলে তার নিকট থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া। কিন্তু যদি সে মারা গিয়ে থাকে কিংবা দূরবর্তী এলাকায় চলে যাওয়ার কারণে ক্ষমা চাওয়া সম্ভব না হয় তবে আল্লাহপাকের নিকট তার গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করতে হবে। অন্য এক হাদীসে রাসুলুল্লাহ স. ইরশাদ করেন, ‘তোমরা ‘গীবত’ করা থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ তাতে তিনটি ক্ষতি রয়েছে- প্রথমত; গীবতকারীর দোয়া কবুল হয় না। দ্বিতীয়ত; গীবতকারীর কোনো নেক আমল কবুল হয় না এবং  তৃতীয়ত; গীবতকারীর আমলনামায় তার পাপ বৃদ্ধি হয়ে থাকে’। (বুখারি ও মুসলিম) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. বলেন, যখন তুমি কারো দোষ বর্ণনা করতে ইচ্ছে করো, তখন নিজের দোষের কথা স্মরণ কর, যাতে গীবতের কারণে জাহান্নামে যাওয়া থেকে বাঁচতে পার। যদি নিজের দোষ না দেখে শুধু অপরের দোষই বর্ণনা করতে থাক তাহলে পরকালে আল্লাহও তোমার দোষ প্রকাশ করবেন” (তিরমিজী)। রাসুলুল্লাহ সা. অন্য এক হাদীসে ইরশাদ করেন, ‘তোমরা অন্যের দোষ অন্বেষণ করবে না, গুপ্তচরবৃত্তি করবে না, পরস্পর কলহ করবে না, হিংসাদ্বেষ করবে না’। (মুসলিম শরীফ) হযরত হাসান ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত রাসুল সা. বলেন, ‘মেরাজের রজনীতে আমাকে এমন একদল মানুষের পাশ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হল, যাদের নখ ছিল ‘তামার’। তারা নখ দ্বারা মুখমণ্ডল ও দেহের গোশত আচড়াচ্ছিলো। আমি জিবরাঈল কে জিজ্ঞাসা করলাম ওরা কারা? তিনি বললেন, ওরা ঐ সকল লোক যারা তাদের মুসলমান ভাইয়ের গীবত করত এবং ইজ্জতহানী করতো”। (তাফসিরে মাযহারি)
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে অন্য ভাইয়ের ‘গীবত’ করা থেকে বিরত রাখার তাওফিক দান করুন। আমীন। লেখক: অধ্যক্ষ সৈয়দপুর ফাজিল মাদ্রাসা, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ