jagannathpurpotrika-latest news

আজ, , ২৯শে শাবান, ১৪৪২ হিজরী

সংবাদ শিরোনাম :




মেয়ে তোমাকে জিততে হবে : নাসিমা জোহা চৌধুরী

আমি মেয়ে। আমার জন্মের সাথে সাথে মা বাবা খুশি হলেও, পরিবারের অন্যান্য সদস্য থেকে শুরু করে, পাড়া প্রতিবেশী কেউই তেমন খুশি হতে পারেন না। যদি আমি দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ মেয়ে হই তাহলে তো ঘরের কাজের বুয়াও ভীষণ বিরক্ত হয়। আমার মাকে নানান কথা শুনতে হয় ঘরে বাইরে। মেয়ে জন্ম নেবার অপরাধে আমাকে অনেকটা অযত্নে বেড়ে উঠতে হয়।

 

কিন্তু সময় পাল্টেছে তাই অধিকাংশ পরিবারে এখন তৃতীয়, চতুর্থ কন্যা কমই জন্মে! প্রথম কন্যা বা একমাত্র কন্যা হিসেবে আমাকে অবশ্যই যত্নের সাথে বড় করা হয়। যদি আমার পিঠেপিঠি একটা বড় বা ছোটভাই থাকে তাহলে অবশ্যই আমাকে কিছুটা হলেও হেলাফেলা করা হয়। আমার ভাইকে সাইকেল দেয়া হলে আমাকে দেয়া হয়না, কারণ একসাথে দুজনকে দেয়ার সামর্থ্য অনেক মা বাবার নেই, তাই আমাকে ঠকতে হয় প্রথম থেকে।

 

আমাকে পালন করা হয় পরের ঘরের জন্য। লেখাপড়া শেখানো হয় একটি ভালো ঘরে বিয়ে দেয়ার জন্য। একটি ভালো চাকরিওলা পাত্র বা টাকাওয়ালা পাত্রের জন্য আমাকে শিক্ষা দীক্ষা দেয়া হয়, আমাকে যেমন সেজে থাকলে সুশ্রী লাগবে তেমন করেই রাখা হয়। আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য মা বাবা ভালো, ধনী পরিবারের পাত্র খোঁজেন, ঘটকের সাথে লাখ টাকার কন্টাক্ট করেন। মা বাবার ঘর থেকে জন্মের পরেই শুরু হয় আমার বিদায়ের আয়োজন। আমার পড়ালেখাও বিদায়ের একটি অংশ, আমার কাজকর্ম শেখাও বিদায়ের একটি অংশ, আমার শারীরিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও বিদায়ের জন্য। বিদায়ের সকল আয়োজন ধীরে ধীরে চলে।

 

আমাকে জানানো হয়, বুঝানো হয় এ ঘর আমার নয়। আমিও সেটা মেনে নিয়ে আগামীর ঘরের প্রস্তুতি নিতে থাকি। কিন্তু হায় আমাকে সেটাও বুঝিয়ে দেয়া হয় আদর আহ্লাদের ফাঁকে ফাঁকে যে সে ঘরও আমার নয়! কথায় কথায় আমাকে শুনানো হয় মেয়েটা পরের ঘরে একদিন চলে যাবে, মেয়েকে কষ্ট দেয়া যাবেনা, এখানে সে আর কদিন আছে। এই বলে আমাকে সবাই যে বাড়তি আদর আহ্লাদ করেন সেটা যে নিছক অনুগ্রহ তা আমি বুঝি। আমি তাই এই ঘর আমারও ঘর, বলে নিজের অধিকার আদায় করতে যদি মরিয়া হয়ে উঠি তখন আমাকে বলা হয় না তোমার ঘর তো অন্যত্র।এটা তোমার ভাইয়ের ঘর হবে।

 

বিয়ের পর যখন আমি বরের বাড়িতে আসি, আমি তখন ভাবতে থাকি যাক এবার নিজের একটা ঘর হল। প্রথম প্রথম কয়েকদিন সবাই বেশ আদর আহ্লাদ করে বলেন এটা তো তোমার ঘর, তোমার বাড়ি। এতোদিন তুমি বাবার বাড়ি ছিলে এখন তুমি নিজের বাড়ি পেয়েছো। আমি তখন আনন্দে ভেসে যাই। আমারও নিজের একটা ঘর আছে আহা হা! কিন্তু যখন নিজের পছন্দে ঘর সাজাতে যাই বা কিছু করতে চাই তখনই বাঁধে বিপত্তি। শ্বাশুড়িমা প্রথম প্রথম বলেন, বৌমা এটা এরকম করো না ওরকম করো, অথবা কোনো জিনিস তুমি আমাকে না বলে করো না। আমি যদি আমার ইচ্ছায় কিছু করতে চাই বা কোথাও যেতে চাই বা কাউকে বাড়িতে আনতে চাই তখন শ্বাশুড়িমা বা পরিবারের অন্যরা বলেন এটা কি তোমার বাবার বাড়ী পেয়েছো? এটা কি তোমার বাড়ি যে যাকে ইচ্ছে ডেকে আনবে, যা ইচ্ছে করবে? বরের সাথে যদি কখনও ঝগড়া হয় বর যখন রেগে বলে এটা কি তোমার ঘর পেয়েছো বা বলে তুমি বের হয়ে যাও আমার ঘর থেকে! তখন আমি চেয়ে দেখি কোথাও আমার কোনো ঘর নেই। না জন্মেছি যেথায় সেখানে, না চিরদিনের জন্য যার সাথে গাঁটছড়া বাঁধলাম সেখানে।

 

কোথাও আমার নিজের একটি ঘর নেই। মুসলিম আইনে যদিও মেয়েরা বাবার সম্পত্তি বা স্বামীর সম্পত্তিতে অংশ পায়, কিন্তু বাস্তবে কতজন বাবা বা স্বামী সেই অংশ মেয়েদের বুঝিয়ে দেন? বলতে পারেন? দেন না এইতো! আমার যদি বরের সাথে ডিভোর্স হয়ে যায় তখন আমাকেই ঘর ছাড়তে হয়। সন্তান থাকুক বা না থাকুক। ঘর ছাড়তেই হয়, সন্তান নিয়ে রাস্তায় নামতে হয়। তখনও স্বামীর সম্পত্তিতে যে আমার প্রাপ্য আছে সেটা দেয়া হয়না। এমনকি একটি ঘরও দেয়া হয়না থাকার জন্য। প্রশ্ন হচ্ছে কেন পনেরো বছরের সংসার যাপন শেষে ও আমি একটি ঘর পাইনা? পাঁচ বছর, পঁচিশ বছর সংসার করার পরও সেই সংসার আমার হয়না! একটি ডিভোর্সে নিজের সাজানো সংসার ছাড়তে হয় কেন? কেন আমার প্রতি এতো বৈষম্য? জন্মের পর থেকে ঠকতে ঠকতে আমাকে মৃত্যু পর্যন্ত ঠকতে হয় কেন? শুধু মেয়ে বলে?

 

আমি যদি তোমাদের প্রচলিত নিয়ম ভেঙে ঘুরে দাঁড়াতে চাই তোমরা তখন আমাকে উৎসাহ না দিয়ে বরং সমালোচনা কর। কিন্তু আমার ভাই যদি ঘুরে দাঁড়াতে চায় তোমরা তখন তাকে বাহবা দাও সর্বাত্মক সমর্থন করো। কেন তোমরা এমন করো? একই বাবা মায়ের মেয়ে হয়েও আমার ভাইয়ের জন্য ঘর হয় আমার জন্য হয়না! বরের বাড়ী একসময় ছেলের বাড়ী হয়, নাতীর বাড়ী হয় কিন্তু আমার কখনও হয়না? আমি এসব দেখতে দেখতে যখন রুখে দাঁড়াতে চাই, বাবার কাছে, বরের কাছে আমার অধিকারের জন্য লড়াই করি,তখন সমাজ আমার গায়ে নির্লজ্জ, লোভী ইত্যাদি তকমা লাগিয়ে দেয়। আমি নিজে পরিশ্রম করে যদি কিছু করতে চাই, সমাজ তখন আমাকে হেয় করে। সমালোচনার ঝড় তুলে আটকাতে চায়, অথবা সমাজ আমার প্রতিপক্ষ হয়ে যায়। আমি মেয়ে, আমি অবশ্যই স্রষ্টার এক বিস্ময়কর সৃষ্টি! যা জেনেবুঝে সমাজ আমাকে দাবীয়ে রাখে, পরিবার আমাকে দাবীয়ে রাখে।

 

আমি সবকিছু ছিঁড়েফোঁড়ে মাথা উঁচু করবোই এ আমার দৃঢ় প্রত্যয়! যে সমাজ আমাকে ঠকাতে চায়, রুখতে চায় আমি সেই সমাজকে চ্যুত করি! আমি মেয়ে। আমি জিতবই।

এখানে ক্লিক করে শেয়ার করুণ